শুক্রবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ছাপানো টাকার উত্তাপে কাঁপছে অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষের স্বপ্ন, সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের

আবদুর রহমান
এপ্রিল ২৪, ২০২৬ ৩:০৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

অর্থনীতির নীরব প্রাঙ্গণে যেন জেগে উঠেছে এক অদৃশ্য অস্থিরতা। কাগজে ছাপা নতুন টাকার ঝলকানি প্রথমে আশার আলো মনে হলেও, সেই আলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর শঙ্কা—মূল্যস্ফীতির দহন।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে ঋণ দেওয়ার এই প্রক্রিয়া, যেখানে ছাপানো টাকাই ভরসা, অর্থনীতির ভেতরে ভেতরে তৈরি করছে অস্থিরতার ঢেউ।

গত বৃহস্পতিবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে ভেসে উঠেছে সেই উদ্বেগের সুর। তাদের ভাষায়, এটি কেবল অর্থের হিসাব নয়—এ যেন ভবিষ্যতের সঙ্গে এক সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান তুলে ধরেন বাস্তবতার কঠিন চিত্র। গত মার্চ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার নিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ—যা মূলত ‘হাইপাওয়ারড মানি’, অর্থাৎ নতুন করে ছাপানো টাকা। এই টাকার প্রবাহ অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি দিলেও, তার উষ্ণতা বাড়িয়ে তুলতে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ—যেন নীরবে জ্বলে ওঠা আগুন, যা একসময় ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

রাজস্ব খাতে সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভেতরে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ভারসাম্যহীনতা। রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আলোচনার বিষয় ছিল পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ—একটি এমন বাস্তবতা, যেখানে দেশীয় দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার ছায়া।

মূল প্রবন্ধে ড. আশিকুর রহমান বলেন, গত ১৮ মাসে দেশের অর্থনীতি এক ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের পথ পেরিয়েছে—যেন ঝড়ের পর টিকে থাকা একটি নৌকা, যা এখনও দুলছে অজানা ঢেউয়ের ভয়ে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ শতাংশে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছেছে ৩০ শতাংশে—এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো এক গভীর সংকেত, যা ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দেয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাইরের চাপ—মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা। এসব মিলিয়ে অর্থনীতির আকাশে জমছে ঘন মেঘ, যেখানে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, রপ্তানির পতন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত তৈরি করছে এক জটিল বাস্তবতা।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান তার বক্তব্যে তুলে ধরেন দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা। তিনি সতর্ক করে বলেন, টাকা ছাপানো বাড়লে এই চাপ আরও তীব্র হবে—যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ভারে অতিরিক্ত ব্যয়ও এই আগুনকে আরও প্রজ্বলিত করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের দ্বিধা—গ্যাস, বিদ্যুৎ ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা না থাকায় তারা এগোতে পারছেন না। আর এই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগও অধরা থেকে যাবে—যেন ভালোবাসার আহ্বান থাকলেও সাড়া মেলে না অনিশ্চয়তার ভয়ে।

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার মনে করিয়ে দেন বৈশ্বিক বাস্তবতার কঠিন প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়া দিচ্ছে, যার ঢেউ এসে লাগছে বাংলাদেশের তীরেও। এই প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রয়োজন বড় ধরনের

সংস্কার—যেমনটি দেখা গিয়েছিল ১৯৯১ সালে।
অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পবকে বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত এবং কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, দেশের অনেক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জই ‘আত্মসৃষ্ট’, যা কাটিয়ে উঠতে দরকার সাহসী ও দেশীয় উদ্যোগ।

সবশেষে, এই গল্প যেন কেবল অর্থনীতির নয়—এটি মানুষের জীবনের গল্প। মূল্যস্ফীতির চাপ, অনিশ্চয়তার ছায়া আর ভবিষ্যতের উদ্বেগের মাঝেও মানুষ খুঁজে ফেরে স্থিতিশীলতার একটুকরো আলো। প্রশ্ন রয়ে যায়—এই অস্থিরতার ভেতর দিয়েই কি জন্ম নেবে নতুন সম্ভাবনা, নাকি ছাপানো টাকার এই উষ্ণতা আরও জ্বালিয়ে তুলবে সংকটের আগুন?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।