মঙ্গলবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘দুর্নীতির ড্রেজারে ভাসছে কোটি কোটি টাকা, আইয়ুব আলীর সাম্রাজ্য—প্রকল্প, সম্পদ আর প্রভাবের অন্ধকার জাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ২৮, ২০২৬ ১২:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নদী মানেই প্রবাহ, স্বচ্ছতা, জীবনের গতি। অথচ সেই নদীর বুকেই যেন জমেছে অস্বচ্ছতার কাদামাটি। ড্রেজিংয়ের নামে খনন হয়েছে শুধু নদী নয়—অভিযোগের স্তরও। আর সেই স্তরের গভীরে বারবার উঠে আসছে এক নাম—প্রকৌশলী আইয়ুব আলী।

কেউ বলেন তিনি দক্ষ কর্মকর্তা, কেউ বলেন অদৃশ্য ক্ষমতার কারিগর। আবার অনেকের চোখে তিনি এক রহস্যময় চরিত্র—যার চারপাশে ঘুরপাক খায় কোটি কোটি টাকার প্রকল্প, টেন্ডার আর অদৃশ্য লেনদেনের গল্প।

ক্ষমতার স্রোতে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য
বলা হয়, নদীর স্রোত যেমন নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেয়, তেমনি আইয়ুব আলীও নাকি সময়ের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন নিজের প্রভাবের এক শক্তিশালী স্রোত। ড্রেজিং প্রকল্প, ড্রেজার ক্রয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন তিনি—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।

রাজনৈতিক ছায়া, প্রভাবশালী যোগাযোগ আর প্রশাসনিক দখল—এই তিনের মিশেলে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য বলয়, যেখানে সিদ্ধান্ত মানেই কোটি টাকার ভাগ্য নির্ধারণ।

দেশ-বিদেশে বিপুল সম্পদ, প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয়, টেন্ডার কারসাজি আর ক্ষমতার অপব্যবহার—সব মিলিয়ে প্রকৌশলী আইয়ুব আলীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অভিযোগের এক বিস্তৃত ও জটিল জাল। সংশ্লিষ্ট মহলে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়ানো এসব অভিযোগ এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, সরকারি প্রকল্পের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার সাম্রাজ্য—যেখানে ড্রেজিং থেকে ড্রেজার ক্রয়, টেন্ডার থেকে বিল অনুমোদন—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন আইয়ুব আলী। রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক, যার সিদ্ধান্তেই নাকি নির্ধারিত হতো কোটি টাকার কাজের ভাগ্য।

ড্রেজিং প্রকল্পগুলোকে ঘিরেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিলের বড় অংশই অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই অর্থের একটি অংশ ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে প্রভাবশালী মহলে গেছে বলেও অভিযোগ।

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার বদলে ছিল কারসাজির ছাপ। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে শর্ত সাজানো, দর বাড়িয়ে দেওয়া, আর কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে কমিশন-নির্ভর সিদ্ধান্তই যেন হয়ে উঠেছিল মূল চালিকাশক্তি।

শ্মশানঘাট টার্মিনালসহ একাধিক প্রকল্প নিয়ে উঠেছে তীব্র সমালোচনা। যেখানে বিদ্যমান অবকাঠামোই পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছিল না, সেখানে নতুন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয়—একে অনেকেই বলছেন “অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা”। বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে পল্টুন ক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে।

ড্রেজার ও জলযান ক্রয়েও রয়েছে অনিয়মের ছাপ। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, অকার্যকর ভেসেল, ব্যবহারহীন সরঞ্জাম—সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কাগজে-কলমে প্রকল্প সম্পন্ন হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগের তালিকা শুধু প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগ-বদলি, পদায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবখানেই ছিল তার প্রভাব। আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন আর বিরোধীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে একাধিক সূত্রে।

এদিকে ঠিকাদারদের অভিযোগ—ঘুষ ছাড়া ফাইল এগোত না। বিল অনুমোদন থেকে শুরু করে টেন্ডার—সব ক্ষেত্রেই অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। কেউ টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হতো—এমন অভিযোগও শোনা যায়।

দুর্নীতির অর্থে গড়ে ওঠা সম্পদের তালিকাও বিস্ময়কর। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত—এমনকি বিদেশেও সম্পদের অভিযোগ উঠেছে। লন্ডন, নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কেনা, আত্মীয়দের নামে সম্পত্তি—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে সম্পদের উৎস নিয়ে।

সমালোচকদের প্রশ্ন একটাই—সরকারি চাকরির বেতন-ভাতায় কীভাবে সম্ভব এই বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া?
যদিও আইয়ুব আলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেছেন, তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি—শুধু অস্বীকার নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়—বরং একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন। তাই আইয়ুব আলীকে ঘিরে এই বিতর্ক এখন বৃহত্তর সিস্টেম সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

৭০০ কোটির ঢেউ—সংখ্যার আড়ালে গল্প-সংখ্যা কখনো মিথ্যা বলে না—কিন্তু সংখ্যার ভেতরের গল্প অনেক সময় অজানা থেকে যায়। প্রায় ৭০০ কোটি টাকার ড্রেজিং বিল—শুনতে উন্নয়নের গল্প। কিন্তু অভিযোগ বলছে, এই অঙ্কের বড় অংশই নাকি অস্বাভাবিক ব্যয়। প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণের খরচ বেড়েছে অদ্ভুতভাবে—যেন নদীর গভীরতার চেয়ে হিসাবের গভীরতাই বেশি রহস্যময়।
এই অতিরিক্ত অর্থ কোথায় গেল? কে পেল এর ভাগ?
এই প্রশ্নগুলো এখনো ভাসছে উত্তরহীনভাবে।

টেন্ডারের খেলায় অদৃশ্য স্ক্রিপ্ট-টেন্ডার মানেই প্রতিযোগিতা—কিন্তু এখানে অভিযোগ, সেই প্রতিযোগিতাই ছিল সাজানো নাটক। শর্ত এমনভাবে তৈরি, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে থাকে। দর এমনভাবে নির্ধারণ, যাতে অন্যরা পিছিয়ে পড়ে। আর সবশেষে—কাজ পায় ‘পছন্দের’ প্রতিষ্ঠান। এ যেন এক অদৃশ্য স্ক্রিপ্ট, যেখানে চরিত্র বদলায়, কিন্তু গল্প একই থাকে।

প্রকল্প না প্রহেলিকা?
শ্মশানঘাট টার্মিনাল, নদী খনন, কার্গো অবকাঠামো—সবকিছুই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—প্রয়োজন ছিল, নাকি তৈরি করা হয়েছিল?
যেখানে পুরোনো অবকাঠামোই পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়নি, সেখানে নতুন প্রকল্প কেন? কেন বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে সরঞ্জাম? সমালোচকদের ভাষায়—এটা উন্নয়ন নয়, এটা পরিকল্পিত ব্যয়ের কবিতা।

যন্ত্রের ভেতরে লুকানো যন্ত্রণা-ড্রেজার, টাগবোট, সার্ভে ভেসেল—সবই এসেছে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে।
কিন্তু অভিযোগ বলছে, অনেক যন্ত্রই অল্প সময়েই বিকল, কিছু পড়ে আছে ব্যবহারহীন, আর কিছু কেবল কাগজেই আছে। যন্ত্র কেনা হয়েছে—কিন্তু কার্যকারিতা কোথায়? প্রশ্নটা যেন জলের নিচে লুকানো পাথরের মতো—দেখা যায় না, কিন্তু আঘাত করে। ক্ষমতার করিডোরে একক উপস্থিতি। অভিযোগ আছে—নিয়োগ, বদলি, পদায়ন—সবখানেই ছিল তার প্রভাব। যারা অনুগত, তারা এগিয়েছে। যারা প্রশ্ন করেছে, তারা সরে গেছে।
এ যেন এক নীরব প্রশাসনিক নাটক—যেখানে সংলাপ কম, ইঙ্গিতই সব বলে দেয়।

ফাইলের ভাষা—টাকার অনুবাদ-ঠিকাদারদের দাবি—ফাইল নিজে চলে না, তাকে ‘চলাতে’ হয়। বিল, অনুমোদন, টেন্ডার—সবকিছুর পেছনে নাকি ছিল অদৃশ্য আর্থিক ভাষা। কেউ বুঝেছে, কেউ মানতে বাধ্য হয়েছে।
আর যারা মানেনি—তাদের ফাইল থেমে গেছে সময়ের জটিলতায়।

সম্পদের গল্প—দেশ পেরিয়ে বিদেশে-ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল—অভিযোগের তালিকায় রয়েছে অসংখ্য সম্পদ। বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, খামার—সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। আর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে—লন্ডন, নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া—সেখানেও সম্পদের অভিযোগ। এ যেন এক জীবনযাত্রার গল্প, যেখানে প্রশ্ন একটাই—এই সম্পদের উৎস কোথায়?

বিলাসী জীবন, অজানা হিসাব-ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণ, পরিবারের বিদেশে অবস্থান, ব্যয়বহুল জীবনযাপন—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। সরকারি বেতনে কি সম্ভব এমন জীবন? নাকি গল্পের ভেতরে আছে অন্য গল্প?

অস্বীকার বনাম প্রশ্নের ধারাবাহিকতা এখন চ্যালেঞ্জের।
আইয়ুব আলী নিজে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিজেকে সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেমে নেই। সমালোচকরা বলছেন— অস্বীকার যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা।

একজন নয়, এক সিস্টেমের প্রতিচ্ছবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়। এটি একটি সিস্টেমের গল্প—যেখানে জবাবদিহি দুর্বল, আর প্রভাব শক্তিশালী। নদী যেমন নিজেকে পরিষ্কার করতে পারে না—তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানও পারে না, যদি না তাকে পরিষ্কার করার ইচ্ছা থাকে।

উল্লেখ্য যে, প্রশ্ন এখনো জেগে আছে কিন্তু আইয়ুব আলী—একটি নাম, নাকি একটি প্রতীক? দুর্নীতির অভিযোগ—বাস্তব, নাকি অতিরঞ্জন? উন্নয়ন—নাকি আড়ালের খেলা? উত্তর এখনো আসেনি। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেমে নেই—বরং নদীর ঢেউয়ের মতোই বারবার ফিরে আসছে।

এসব বিষয় জানতে চেয়ে প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও ফোন কল গ্রহণ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোন জবাব মেলেনি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।