ফাইল ছবি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শান্ত নদীপথে রোববার দুপুরে যেন হঠাৎই নেমে আসে উত্তেজনার ঝড়। একটি নৌকার ছোট্ট বসার জায়গা—সেখান থেকেই শুরু হয় কথার লড়াই, আর সেই লড়াই মুহূর্তেই রূপ নেয় নির্মম সংঘর্ষে। কিল-ঘুষির আঘাতে নিথর হয়ে পড়েন হানিফ মিয়া (৪০), এক সাধারণ মানুষ, যার গন্তব্য ছিল মেয়ের বাড়ি—কিন্তু পৌঁছানো হলো না আর।
নিহত হানিফ মিয়া সদর উপজেলার বগডহর গ্রামের উত্তরপাড়ার বাসিন্দা, প্রয়াত হারিজ মিয়ার বড় ছেলে। জীবনের সহজ-সরল পথে চলা এই মানুষটির শেষ যাত্রা হলো অপ্রত্যাশিত এক সহিংসতায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীপথে যাত্রার সময় নৌকায় বসা নিয়ে পাশের মোহল্লা গ্রামের এলেম খার সঙ্গে বাগবিতণ্ডা বাধে। কথার ঝাঁজ বাড়তে বাড়তে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। একপর্যায়ে এলেমের কিল-ঘুষিতে গুরুতর আহত হন হানিফ। দ্রুত তাকে নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান—সব শেষ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় গল্প। রাত নামতেই ঘটনার মোড় নেয় এক ভিন্ন দিকে। বিচারালয়ের পথে না গিয়ে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের উদ্যোগে বসে সালিশ বৈঠক। সেই বৈঠকে যেন টাকার অঙ্কে মাপা হলো একটি প্রাণের মূল্য—২০ লাখ টাকা। নগদ চার লাখ টাকায় শুরু, বাকি ১৬ লাখ পরিশোধের সময়সীমা মাত্র ১০ দিন।
এই আপোষের সিদ্ধান্তে দুই গ্রামের ‘সম্প্রীতি’ রক্ষার কথা বলা হলেও, নীরব ক্ষোভ আর প্রশ্নে ফুঁসছে এলাকাবাসী—একটি প্রাণ কি এভাবেই মীমাংসা হয়? ন্যায়বিচার কি টাকার অঙ্কে লেখা যায়?
সালিশে সভাপতিত্ব করেন বগডহর গ্রামের মোহাম্মদ সামছুল হক, পরিচালনা করেন নবীনগর পূর্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। উপস্থিত ছিলেন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মেহেদী হাসানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে মেহেদী হাসান বলেন, মৃত ব্যক্তি গরিব, আমাদেরই লোক। দুই গ্রামের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতেই উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সিদ্ধান্ত।
তবে আইনের চোখে বিষয়টি স্পষ্ট—হত্যার বিচার এভাবে হয় না। নবীনগর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, এ ধরনের সালিশ আইনবহির্ভূত। পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মামলা হয়নি, তবে পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করেছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
নদীর ঢেউ থেমে যায়, কিন্তু প্রশ্নের ঢেউ থামে না—
একটি জীবন হারানোর পর, সত্যিই কি সবকিছু এত সহজে মিটে যায়?
