গাজীপুর মহানগরীর পূবাইলের করমতলা যেন এখন এক জলবন্দী দ্বীপ—চারদিকে শুধু থমকে থাকা পানি, আর সেই পানির মাঝেই আটকে পড়া মানুষের অসহায় দিনযাপন। ৫০টিরও বেশি পরিবার এখানে প্রতিদিন লড়ছে পানির সাথে, ভাঙা পথের সাথে, আর অবহেলার দীর্ঘশ্বাসের সাথে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৪২নং ওয়ার্ডের করমতলা এলাকার প্রতিটি গলি, প্রতিটি উঠান, প্রতিটি ঘরের সামনে জমে আছে বৃষ্টির পানি। নেই কোনো সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নেই চলাচলের উপযোগী রাস্তা। ফলে কোমরসমান পানি ভেঙেই শিশু, বৃদ্ধ—সবাইকে চলাফেরা করতে হচ্ছে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপই একেকটি সংগ্রাম।
এই জলাবদ্ধতা শুধু পথরোধ করেনি, থামিয়ে দিয়েছে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দও। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে। এমনকি জরুরি মুহূর্তেও নেই কোনো সহায়তা—আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে পারবে না, অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার কোনো উপায় নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী নারীর কণ্ঠে শোনা যায় অসহায়তার ভারী সুর— বৃষ্টি নামলেই আমরা পানিবন্দী হয়ে পড়ি। রাস্তা না থাকায় বাড়ির কাজ বন্ধ, কোথাও যাওয়া যায় না। মূল সড়কে উঠতে কোমরপানি ভেঙে যেতে হয়। মনে হয় আমরা যেন এই শহরের কেউই নই, একেবারে বিচ্ছিন্ন।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন জানান, এখানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার বসবাস করে। নিচু জমির কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। রান্না করা পর্যন্ত কঠিন হয়ে যায়—অনেকেই বাধ্য হয়ে একবেলা খেয়েই দিন কাটাচ্ছেন।
তার কথায় উঠে আসে ক্ষোভ আর বঞ্চনার ব্যথা—
সিটি কর্পোরেশনের সব নিয়ম মেনেও আমরা কোনো নাগরিক সুবিধা পাচ্ছি না। ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে জমি ভরাট করা হয়েছে, একমাত্র ড্রেনটিও বন্ধ করে দিয়েছে অসাধু চক্র। এভাবে আর কতদিন?
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনলেই কেবল এই জলবন্দী জীবনের অবসান ঘটবে।
করমতলার এই পানিবন্দী জনপদ আজ শুধু একটি এলাকার গল্প নয়—এটি নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা, অবহেলা আর মানুষের নীরব কষ্টের এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিটি ঘর, প্রতিটি পরিবার যেন অপেক্ষা করছে—কবে শুকাবে এই পানি, কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবনের আলো।
