রাজশাহীতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগ আবারও সামনে এনেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও নৈতিকতার প্রশ্ন। একই বাহিনীর এক নারী সার্জেন্টের লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে বিয়ের নামে প্রতারণা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং অর্থ আত্মসাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়—যা আইনগত দৃষ্টিকোণের পাশাপাশি মানবিক দিক থেকেও গভীর উদ্বেগজনক।
অভিযোগকারী, আরএমপির ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সার্জেন্ট মোসা. সাবিহা আক্তার, তার অভিযোগে উল্লেখ করেন—২০২০ সালে পরিচয়ের সূত্র ধরে তৎকালীন বোয়ালিয়া মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব আলম পূর্বের বৈবাহিক তথ্য গোপন রেখে তাকে বিয়ে করেন।
বিয়ের পর থেকেই সম্পর্কটি একতরফা নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক চাপে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সংসার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত কর্মকর্তার একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই তাকে মারধর ও অপমানের মুখে পড়তে হতো। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক চার মাসের গর্ভপাত করানো হয়—যা তার শারীরিক ও মানসিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার আশায় তিনি বিশ্বাসের জায়গা থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা অভিযুক্তকে দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। বর্তমানে তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যার দায়িত্ব একাই পালন করছেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মাহবুব আলম অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে খামের মধ্যে টাকা নিতে দেখা গেলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরদিনই তাকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করে আরএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয় এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির অধীনে সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তার গুরুতর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত না হলে বাহিনীর প্রতি জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোসা. সাবিহা আক্তার অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করলেও বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নানা অভিযোগের কারণে মাহবুব আলম-কে সিরাজগঞ্জ ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং বর্তমানে তাকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
তবে এত অভিযোগের পরও কেন তিনি চাকরিতে বহাল—এ প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া সহজ নয়। আইনি কিছু জটিলতা রয়েছে। বিভাগীয় প্রক্রিয়া চলমান আছে, তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মাহবুব আলম ফোনকল রিসিভ করেননি।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়—এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহির একটি বড় পরীক্ষা।
