বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, বিতর্কিত পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (মূল পদবী উপ-মহাব্যবস্থাপক) মোঃ রাশেদুর রহমান।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি বিসিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ৯ অক্টোবর নিয়োগাদেশ পেলেও প্রায় আট বছর পর, ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর বিসিকে যোগদান করেন রাশেদুর রহমান।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই প্রশাসনিক ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নানা কার্যক্রমে তার প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিসিকের ভেতরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন বলয়ের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং রাজনৈতিক আনুগত্যকে ব্যবহার করে প্রশাসনিক অবস্থান শক্তিশালী করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও নিয়মিতভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পোস্ট দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার পর তার ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়ে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। বিসিকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল বলে দাবি করেছেন একাধিক ঠিকাদার ও অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার পছন্দের বাইরে থাকা ঠিকাদারদের কাজ না দিতে নানা কৌশল প্রয়োগ করা হতো। এভাবেই বিসিকের ভেতরে একটি প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন রাশেদুর রহমান।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক থেমে নেই। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনামূলক পোস্ট দেন। বিষয়টি নিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন অনলাইন ও জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সেইসব প্রতিবেদন, ফেসবুক পোস্টের কপি এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও প্রভাব ও অর্থের জোরে তিনি দায় এড়িয়ে যান।
এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাকে নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিসিক কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি কিংবা ফলাফল সম্পর্কে এখনো কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত চলমান অবস্থাতেই রাশেদুর রহমানকে সহকারী মহাব্যবস্থাপক থেকে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, পরে বিসিকের মহাব্যবস্থাপকের শূন্য পদের বিপরীতে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিসিকের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ এখনো বজায় রয়েছে এবং অবৈধ আর্থিক সুবিধার একটি অংশ রাজনৈতিক বলয়ে ব্যয় করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবুও বিসিকের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোঃ রাশেদুর রহমান বলেন, তিনি বর্তমানে একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিসিকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের মধ্যেই পদোন্নতির মতো ঘটনা যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দেয়। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না।
