শনিবার, ১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি সংকটের দীর্ঘ ছায়া ১৫ বছরে ৭ উপাচার্য, চারজনের বিদায়ই ছিল অস্বস্তিকর; নতুন ভিসিকেও ঘিরে শুরু বিরোধিতার সুর

বরিশাল জেলা প্রতিনিধি
মে ১৫, ২০২৬ ১০:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বা থেকে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম, অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন, অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া ও অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক। ছবি: সংগৃহীত

চার বছরের পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের বিধান থাকলেও প্রতিষ্ঠার দেড় দশক পেরোতেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) বদলেছে সাতজন উপাচার্য (ভিসি)। কিন্তু সেই পথচলায় স্থিতিশীলতার বদলে বারবার সামনে এসেছে আন্দোলন, বিরোধ, বলয় রাজনীতি ও অকাল বিদায়ের ঘটনা। সাত ভিসির মধ্যে চারজনকেই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিতর্ক ও চাপের মুখে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।

সবশেষ শুক্রবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ। তবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে বিরোধিতার গুঞ্জন, যা নতুন করে আলোচনায় এনেছে ববির দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অস্থিরতাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিদায়ী চার উপাচার্যের মধ্যে তিনজনই শিক্ষার্থী আন্দোলনের চাপে পড়েছিলেন। আর সর্বশেষ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে বিদায় নিতে হয়েছে শিক্ষকদের টানা আন্দোলনের মুখে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় উপাচার্যরা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে নিজেদের ঘনিষ্ঠ বলয় গড়ে তোলেন। সেই বলয়ের বাইরে থাকা অংশ ক্ষোভ জমিয়ে রাখে এবং সুযোগ পেলেই আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরও উসকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তৌফিক আলমকে ঘিরে টানা উত্তাপ

সদ্য বিদায়ী উপাচার্য ড. তৌফিক আলমের বিরুদ্ধে ৬০ জন শিক্ষকের পদোন্নতি ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি ঘিরে শিক্ষকরা ধারাবাহিক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন এবং একপর্যায়ে তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

শিক্ষকদের দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে হবে। তবে উপাচার্য অনড় ছিলেন ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালার পক্ষে। এই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
গত বছরের ১৫ মে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি পূর্ণকালীন নিয়োগ পান। সব মিলিয়ে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।

নতুন ভিসিকে ঘিরেও অস্বস্তির আবহ

নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ এর আগে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পবিপ্রবি ইউনিটের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। গত ডিসেম্বরে তিনি ববির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।

শুক্রবার বিকেলে ক্যাম্পাসে পৌঁছালে শিক্ষক-কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। কিন্তু এর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে তার অপসারণ দাবিতে পোস্টার ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাকে ‘অযোগ্য’ ও ‘বিতর্কিত’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি, বিক্ষোভের নেপথ্যে ছিল জাতীয় ছাত্রশক্তি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামী ছাত্র মজলিসের কিছু নেতাকর্মী। ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার গুঞ্জনও শোনা গেলেও প্রকাশ্যে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

অন্যদিকে একই সময়ে নবনিযুক্ত উপাচার্যকে স্বাগত জানিয়ে অবস্থান নেয় ববি ছাত্রদল। ফলে সম্ভাব্য পাল্টা কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত মাঠে নামেনি।

ববি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন,
“৫ আগস্টের পর একটি গোষ্ঠী কখনও সাধারণ শিক্ষার্থী, কখনও জনতার ব্যানারে মব তৈরির চেষ্টা করছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা একই কৌশল নিতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাড়া না পাওয়ায় তারা ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ববি শাখার সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে কর্মসূচি ডেকেছিল, আমরা সংহতি জানিয়েছি। তবে প্রস্তুতি না থাকায় তা হয়নি। তিনি একটি অনুষদের ডিন ছিলেন—তার পক্ষে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সামলানো কঠিন হবে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে দেখতে চাই।

যেভাবে বিদায় নিতে হয়েছে চার উপাচার্যকে
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের বিদায় যেন বারবারই লিখেছে অস্থিরতার গল্প।

২০২৪ সালের ৪ মার্চ দায়িত্ব নেওয়া ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া মাত্র ছয় মাসের মাথায় ছাত্র আন্দোলনের মুখে ২০ আগস্ট অপসারিত হন। আন্দোলনকারীরা তাকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ বলে অভিযুক্ত করেছিল।

এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. শুচিতা শারমিন। কিন্তু আট মাসের মাথায় তিনিও আন্দোলনের চাপে গত বছরের ১৪ মে পদ ছাড়তে বাধ্য হন। পরদিন অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পান ড. তৌফিক আলম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য ড. এস এম ইমামুল হক মেয়াদ পূর্ণ করলেও শেষ দিকে ছাত্র আন্দোলনের কারণে দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, আন্দোলন ঠেকাতে প্রায় সবাই শেষ মুহূর্তে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কেউ ক্ষমা চেয়েছেন, কেউবা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের চেয়ার কি এখন শুধুই ক্ষমতার নয়, অনিশ্চয়তা আর সংঘাতেরও প্রতীক?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
সারাবাংলা সর্বশেষ