ফাইল ছবি
হাসপাতালে মানুষ যায় সুস্থতার আশায়, জীবনের নিরাপত্তা খুঁজতে। অথচ সেই হাসপাতাল থেকেই যদি রোগীর হাতে তুলে দেওয়া হয় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ—তাহলে সেটি শুধু অবহেলা নয়, এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঠিক এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে এখন এলাকাজুড়ে তীব্র আলোচনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ৪ মে হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে অর্ধশতাধিক রোগীকে এমন ওষুধ দেওয়া হয়েছে, যার মেয়াদ কয়েক মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যখন ভরসা রেখেছিলেন সরকারি হাসপাতালের ওপর, তখন অজান্তেই তারা সেবন করেছেন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কেউ ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন, কেউ আবার নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
জানা গেছে, উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা নিয়ে গত ৪ মে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান শফিকুল ইসলাম নামে এক রোগী। বহির্বিভাগের ২০৩ নম্বর কক্ষের দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে ‘অ্যামডোক্যাল’ ট্যাবলেট ব্যবহারের পরামর্শ দেন। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ওষুধও সংগ্রহ করেন তিনি।
কিন্তু কয়েকদিন ওষুধ খাওয়ার পর হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় ওষুধের গায়ে লেখা ছোট্ট একটি তারিখে। বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি দেখতে পান—ওষুধটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই!
শফিকুল ইসলামের কণ্ঠে তখন হতাশা আর ক্ষোভের মিশ্র প্রতিধ্বনি—
হাসপাতালে গিয়েছিলাম সুস্থ হতে, কিন্তু না জেনে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খেয়েছি কয়েকদিন। এটা শুধু অবহেলা নয়, রোগীদের জীবনের সঙ্গে নির্মম খেলা।”
তিনি দাবি করেন, ওইদিন একই ধরনের ওষুধ আরও বহু রোগীকে দেওয়া হয়েছে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান দেবিদ্বার পৌর এলাকার মাছুয়াবাদ ডোন এলাকার ট্রাক্টরচালক বিল্লাল হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপের ওষুধ খাওয়া এই রোগী বলেন, প্রথমে তিনি মেয়াদের বিষয়টি খেয়াল করেননি। কিন্তু ওষুধ সেবনের পর শরীর আরও খারাপ লাগতে শুরু করলে সন্দেহ তৈরি হয়।
পরে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, যে ওষুধ তিনি খাচ্ছিলেন তার মেয়াদ তিন মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে।
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বিল্লাল বলেন, তাদের এমন ভুলের কারণে আমার বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যায়, মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ফিরতে নয়।
ঘটনার বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. কবির হোসেন বলেন, স্টোর থেকে ওষুধ সরবরাহের আগে সাধারণত মেয়াদ যাচাই করা হয়। তারপরও কীভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি বলেন, মেডিকেল এরর পৃথিবীর সব জায়গাতেই কমবেশি ঘটে। আমরা মানুষ, ভুল হতেই পারে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। তাদের প্রশ্ন—যে ভুল একজন রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে, সেই ভুলের দায় কি শুধুই একটি সাধারণ ‘মানবিক ত্রুটি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়?
এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের পর প্রশাসন সত্যিই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, নাকি সবকিছু চাপা পড়ে যায় হাসপাতালের নীরব দেয়ালের আড়ালে।
