ভূমি অফিসে নামজারি, খারিজ কিংবা জমি সংক্রান্ত সেবার জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নওগাঁর এক ভূমি কর্মকর্তার নাম। ঘুষ বাণিজ্য, ভুয়া খতিয়ানের মাধ্যমে খারিজ অনুমোদন, প্রভাব খাটিয়ে পুকুর দখল এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলোচনার ঝড় তুলেছেন নওগাঁ শহরের পৌরসভা-চকদিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা হাবিবুজ্জামান জিয়া।
স্থানীয়দের প্রশ্ন— একজন ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কীভাবে অল্প কয়েক বছরের চাকরিজীবনে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন?
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট নওগাঁ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই হাবিবুজ্জামান জিয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ আরও জোরালো হতে থাকে। ভূমি সংশ্লিষ্ট যেকোনো কাজ, বিশেষ করে নামজারি ও খারিজ করতে গেলে নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয় সেবাগ্রহীতাদের। এমনকি ভুয়া খতিয়ানের ভিত্তিতেও খারিজ অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি খাদেশুল ইসলাম এবং একটি মাদরাসার জমির খারিজ সংক্রান্ত ঘটনায় ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি ও ঘুষ হিসেবে নেওয়া এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এ ঘটনায় গত মে মাসে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে— অভিযোগের পর অভিযোগ জমা হলেও কেন বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন এই কর্মকর্তা?
ফ্ল্যাট, জমি আর সম্পদের পাহাড়
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি নওগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র কাজির মোড়ে অবস্থিত “ডক্টর হাইটস” নামের একটি বহুতল ভবনে প্রায় ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন হাবিবুজ্জামান জিয়া।
ভবনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৬১ থেকে ৬২ লাখ টাকার মধ্যে। দুই মাস আগে ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন জিয়া এবং বর্তমানে তার পরিবার সেখানে বসবাস করছে।
ভবনটির কেয়ারটেকার সাবু বলেন, আমি নিজেই প্রায় দুই মাস আগে ৬১ লাখ টাকায় জিয়ার জন্য ফ্ল্যাটটি কিনে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলাম।
শুধু ফ্ল্যাটই নয়, ২০২১ সালে নিজের ও বোনের যৌথ নামে শহরের চকদেব মৌজায় প্রায় ৬৭ দশমিক ৩ শতক জমি কেনেন তিনি। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি।
এছাড়া গ্রামের বাড়ি নারটী ও পুটিমারি মৌজায় ৬ থেকে ৭ বিঘা জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, তার নামে-বেনামে আরও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যার প্রকৃত হিসাব অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসতে পারে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ভুয়া খতিয়ানে খারিজের অভিযোগ
এর আগেও সদর উপজেলার হাপানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে একটি ভুয়া খতিয়ানের মাধ্যমে খারিজ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই অভিযোগেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পুকুর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাত
শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে পুকুর দখলের অভিযোগও রয়েছে হাবিবুজ্জামান জিয়ার বিরুদ্ধে।
নারটী গ্রামের বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী মোস্তফা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের শরিকানা পুকুর জোর করে দখল করে নিয়েছে জিয়া। তার অংশ ছিল মাত্র এক ভাগ, কিন্তু এখন পুরো পুকুরের মালিকানা দাবি করে। লোকজন নিয়ে এসে আমাদের মারধর করেছে। আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধেই মামলা করেছে।
মোস্তফার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ভূমি কর্মকর্তা হওয়ার পর থেকেই জিয়ার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। প্রভাব খাটিয়ে তিনি একাধিক জলাশয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন এবং অন্য কাউকে সেখানে প্রবেশ করতেও দেন না।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, রেকর্ডগত জটিলতাকে পুঁজি করে পুকুরটির মালিকানা দাবি করছে জিয়া। তবে চাকরিতে যোগদানের পর তার সম্পদ ও জমির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় এক ভুক্তভোগী নারী জানান, এই এলাকাতেই প্রায় দুই বিঘা জমি কিনেছে জিয়া। তার সম্পদের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
সহায়তা নিয়ে এক সময় চিকিৎসা করতেন, এখন কোটি টাকার মালিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, একসময় চিকিৎসার খরচ জোগাতেও অন্যের সহায়তা নিতে হতো হাবিবুজ্জামান জিয়াকে। কিন্তু ২০১১ সালে চাকরিতে যোগদানের পর তার জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
তাদের ভাষ্য, চাকরির পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি বিপুল অর্থের মালিক। কালো টাকা বৈধ করার জন্য বিভিন্ন পুকুর ও জমির ব্যবসাতেও জড়িয়েছেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
নীরব অভিযুক্ত, তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও হাবিবুজ্জামান জিয়া প্রথমে ব্যস্ততার অজুহাত দেন। পরে বারবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযোগের পাহাড় জমলেও যদি তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় পাবে ন্যায়বিচার?
এখন নজর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দিকে। কারণ অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং ভূমি প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেবে।
