ফাইল ছবি
এক দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লার মেধাবী শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যার রহস্য এখনো ঘনীভূত অন্ধকারে ঢাকা। বহুল আলোচিত ও দেশের অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন অগ্রগতির আশায় তাকিয়ে থাকা মানুষের প্রত্যাশা আবারও থমকে গেছে। কারণ, গ্রেপ্তার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল দেড় মাস পার হলেও এখনো হাতে পায়নি তদন্ত সংস্থা।
সোমবার কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাফিজুর রহমানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হকের এজলাসে শুনানি অনুষ্ঠিত হলেও তার পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি। শুনানি শেষে তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৬ এপ্রিল মামলার তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন আদালত। ওই সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও মিলিয়ে দেখার আবেদন করেন। সন্দেহভাজনদের মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ, সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সাবেক সৈনিক শাহীন আলম।
পরে আদালতের নির্দেশে গত ২২ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই সময় তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম জানান, “হাফিজুর রহমানের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এখনো হাতে আসেনি। এছাড়া অপর দুই সন্দেহভাজন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ ও সাবেক সৈনিক শাহীন আলমকে আইনের আওতায় আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর মরদেহ। সেই মর্মান্তিক ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন।
এরপর দীর্ঘ তদন্তের পথ পাড়ি দিয়েছে মামলাটি। থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)—একাধিক সংস্থা তদন্ত করলেও আজ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলার তদন্তভার সিআইডি থেকে পিবিআই সদর দপ্তরে হস্তান্তর করা হয়।
প্রায় চার বছর ধরে মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম।
দশ বছর পরও তনু হত্যার বিচার ও সত্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার, স্বজন এবং পুরো দেশ। ডিএনএ রিপোর্ট কি শেষ পর্যন্ত এই রহস্যের জট খুলবে, নাকি আরও দীর্ঘ হবে অপেক্ষার প্রহর—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সবাই।
