আবারও আলোচনায় জহুরুল: ১৪ কোটি টাকার টেন্ডার বিতর্কের মাঝেই ৭৮ লাখ টাকার কাজ না করেই বিল পরিশোধের গুরুতর অভিযোগ। ফাইল ছবি
ঢাকার বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রিভেনশন সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ১৪ কোটি টাকার একটি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে নতুন করে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। টেন্ডার মূল্যায়নে অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করেছে অংশগ্রহণকারী একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের শেরেবাংলা নগর বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, বৈধ ও যোগ্য দরদাতাদের অযোগ্য ঘোষণা করে পূর্বনির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
১৪ কোটি টাকার টেন্ডার, সাত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, শুরু বিতর্ক
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, Interior Decoration Works of the Multipurpose Hall and Lobby, Conference Hall and Lobby, Reception Lounge, Internal Electrical Works, Sound System and Acoustic Worksসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ শীর্ষক টেন্ডার (আইডি: ১২৬৭০৮৪)-এর দরপত্র গত ২১ মে ২০২৬ তারিখে খোলা হয়।
টেন্ডার ওপেনিং রিপোর্টে দেখা যায়, মোট সাতটি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। এর মধ্যে— সর্বনিম্ন দরদাতা: M/S Confidence Trade International — ১৩ কোটি ৬৯ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৮ টাকা।
দ্বিতীয় সর্বনিম্ন: Hossain Construction (Pvt.) Ltd.
তৃতীয় সর্বনিম্ন: Chowdhury & Hai (JV)
তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা Chowdhury & Hai (JV)-এর লিড পার্টনার হাছিনা আক্তার চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, টেন্ডার মূল্যায়নের সময় যোগ্য দরদাতাদের অযোগ্য করার জন্য অসহ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন হলে ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।
পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা—উঠছে বড় প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়েছে। তাই পুরো টেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের জোর দাবি উঠেছে।
ঠিকাদার মহলে আরও আলোচনা রয়েছে, বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে টেন্ডারটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক দুর্নীতি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আলোচনায় জহুরুল
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরেও নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামকে ঘিরে নানা আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করে তিনি ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
এমনকি বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো সরকারি নথি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
নতুন বিস্ফোরণ: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮ লাখ টাকার কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ
১৪ কোটি টাকার টেন্ডার বিতর্কের মাঝেই জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ পাওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকা প্রকৃত কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
কোথায় ছিল বরাদ্দ?
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায়—
শ্যামলীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল,
মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার,
১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতালের মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, অর্থবছরের শেষদিকে অনুমোদন পাওয়ার পর অস্বাভাবিক দ্রুততায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অধিকাংশ কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে কাজ সম্পূর্ণ শেষ দেখিয়ে জুন মাসেই পুরো বিল পরিশোধ করা হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার ভয়ে অনেকেই তড়িঘড়ি করেন। কিন্তু প্রকৃত কাজ না করেই বিল দেওয়া সরাসরি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা আইন লঙ্ঘনের শামিল।
একই ঠিকাদার, একই পদ্ধতি—সিন্ডিকেটের ছায়া?
তদন্তে জানা যায়, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে LTM (Limited Tendering Method) পদ্ধতিতে, যেখানে অংশ নিয়েছে মাত্র একজন বা দুইজন ঠিকাদার।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ঠিকাদার নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ একটি সিন্ডিকেটের অংশ।
পিপিআর অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে দরপত্র বাতিল করার সুযোগ থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এক কর্মকর্তা বলেন, বছরের পর বছর একই ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানোর পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
কাগজে শতভাগ কাজ, বাস্তবে ধুলোও উড়েনি-
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, টিবি হাসপাতালের কিছু মেরামত কাজ মাত্র ২০-৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। মা ও শিশু হাসপাতালের কয়েকটি সেকশনে শ্রমিক পর্যন্ত যায়নি। ফার্টিলিটি সেন্টারের ভাঙা অংশ এখনও আগের অবস্থায় পড়ে আছে।
কিন্তু সরকারি কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে—১০০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন এবং ব্যবহারযোগ্য।
অভিযোগকারীদের ভাষায়, এটি শুধু অনিয়ম নয়, বরং সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা।
কী বলছেন জহুরুল ইসলাম?
অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে। মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি-সাপেক্ষে প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার পরই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আপনারা চাইলে প্রত্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে কাজ শেষ না হলেও কাগজপত্র ঠিক রাখা হয়েছে।
আইন কী বলছে?
সরকারি বিধি অনুযায়ী—
কাজ সম্পন্ন না করে বিল প্রদান,
প্রতিযোগিতাহীন দরপত্র,
সিন্ডিকেটভিত্তিক ঠিকাদার বাছাই,
এসবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রমাণিত হলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, সাময়িক বরখাস্ত, আর্থিক জরিমানা এবং সরকারি অর্থ ফেরত আদায়ের বিধান রয়েছে।
এখন নজর প্রধান প্রকৌশলীর সিদ্ধান্তে
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন মহলের প্রশ্ন : ১৪ কোটি টাকার টেন্ডার বিতর্ক এবং ৭৮ লাখ টাকার বিল কেলেঙ্কারির অভিযোগ—এসব কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি গণপূর্তের ভেতরে আরও বড় কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত?
এখন সবার চোখ প্রধান প্রকৌশলীর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত হবে কি না, সেটিই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
