ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতকে ঘিরে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কথিত দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কেট পরিচালনা, দোকান বরাদ্দ ও টেন্ডার কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও একই সময়ে প্রকৌশল বিভাগের আরেক আলোচিত কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবের পদোন্নতি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একই প্রশাসনিক বলয়ের বিরুদ্ধে যখন দীর্ঘদিন ধরে সিণ্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে, তখন এক কর্মকর্তা ওএসডি বা বহিষ্কারের মুখে পড়লেও আরেকজন কীভাবে পদোন্নতির সুবিধা পেলেন?
‘প্রভাব বলয়’ নাকি প্রশাসনিক সুরক্ষা?
অভিযোগ রয়েছে, ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিণ্ডিকেট টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প অনুমোদন, কাজ বণ্টন, বিল পরিশোধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই বলয়ের অন্যতম আলোচিত সদস্য ছিলেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব। তাদের সঙ্গে প্রশাসনের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো নিরপেক্ষ ও চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
টেন্ডার কারসাজি ও ‘পছন্দের ঠিকাদার’ বিতর্ক
অভিযোগ রয়েছে, কিছু টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহজেই অংশ নিতে পারে এবং অন্য প্রতিযোগীদের কার্যত বাইরে রাখা যায়।
এতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
কিছু প্রকল্পে কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজ গ্রহণ এবং মান যাচাই ছাড়াই অর্থ ছাড়ের ঘটনাও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় এসেছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
ডিএসসিসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী—
গাড়ির জ্বালানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি;
পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো;
ভুয়া লগবই ব্যবহার করে অতিরিক্ত ট্রিপ প্রদর্শন;
লজিস্টিকস ব্যয়ের নামে অর্থ উত্তোলন;
মাস্টাররোল ও বাস্তব কর্মীর তালিকায় অসঙ্গতি;
উপস্থিতি ও বেতন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব।
যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
কাজী সালেহ মুস্তানজির বহিষ্কার, নতুন করে আলোচনায় আহসান হাবীব
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ডিএসসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) কাজী সালেহ মুস্তানজিরকে বহিষ্কার করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাজী সালেহ মুস্তানজির, গোলাম কিবরিয়া এবং আহসান হাবীবের মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক সমন্বয় ছিল এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তারা একই বলয়ের অংশ হিসেবে কাজ করতেন।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে ‘বাসায় চলুন’ মন্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের কাছে সাংবাদিকরা ব্যাখ্যা চাইলে তিনি নাকি বলেন, আপনাদের অভিযোগ দেওয়ার দরকার নেই, আপনারা আমার বাসায় চলুন।
এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে সাংবাদিকদের বিদায় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই মন্তব্যের পর ডিএসসিসির ভেতরে ও বাইরে নতুন করে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুতর অভিযোগের জবাব কি ব্যক্তিগত পরিসরে দেওয়া উচিত, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়?
ওএসডি একজন, পদোন্নতি আরেকজন—কার ছত্রচ্ছায়ায় এই সিণ্ডিকেট?
ডিএসসিসির অভ্যন্তরে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—
গোলাম কিবরিয়া বরখাস্ত হলেও আহসান হাবীব কীভাবে পদোন্নতি পেলেন?
প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, পুরো বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের আওতায় এনে টেন্ডার, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রয়োজন।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের অভিযোগ ভবিষ্যতে আরও গভীর আস্থাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।
এখন নজর তদন্তের দিকে
বর্তমানে গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে আহসান হাবীবসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি উঠছে।
জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—
ডিএসসিসির প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে কথিত এই সিণ্ডিকেটের প্রকৃত চিত্র কি সামনে আসবে, নাকি ওএসডি ও পদোন্নতির আড়ালে চাপা পড়ে যাবে বহু কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ?
(চলবে… চতুর্থ পর্বে: টেন্ডার, ঠিকাদার ও প্রকল্প অনুমোদনের নেপথ্যে কারা?)
