রবিবার, ১২ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গণপূর্ত ই/এম-৫: প্রকৌশলী তামজীদ–রাজিয়া সুলতানা জুটির একের পর এক কাণ্ড, বিভাগজুড়ে তোলপাড়, ঠিকাদারদের ক্ষোভ, অভিযোগের কেন্দ্রে মসজিদ প্রকল্পও

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১১, ২০২৬ ১:৫১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ছবির ক্যাপশন: পর্ব-৫ : মসজিদের কাজেও দুর্নীতির বিষাক্ত ছোবল। নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদা ও এসডিই রাজিয়া সুলতানা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেন ও এসডিই রাজিয়া সুলতানাকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগে এখন বিভাগজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা ও নানা কানাঘুষা। অভিযোগ উঠেছে, গোটা অর্থবছরজুড়ে বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে অসংখ্য এস্টিমেট বিক্রি করে এই দু’জন বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের কথিত অনিয়ম ও লুটপাটের বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি আল্লাহর ঘর মসজিদও।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের পাঁচতলা ভবনের নির্মাণকাজ এখনও পুরোপুরি শেষ না হলেও ই/এম অংশের বিভিন্ন কাজ আগেভাগেই টেন্ডার দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এমনকি চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষেই এসব কাজের পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি। অথচ সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের পঞ্চম তলার কাজ এখনও চলমান এবং পুরো একটি তলার নির্মাণ বাকি রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ওটিএম টেন্ডার আইডি নং ১০০২৬৪৬-এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের নির্মাণাধীন ভবনের জন্য ১০০০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র দুটি করে সিডিউল বিক্রি, জমা ও রেসপন্স দেখিয়ে কাজটি দেওয়া হয় মেসার্স মামুন অ্যান্ড ব্রাদার্স-কে। কাজটির চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা হলেও এপিপি অনুযায়ী বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাত্র ০.৯৮ শতাংশ ঊর্ধ্বদরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হলে অন্তত ১০ শতাংশ কম দর পাওয়া সম্ভব ছিল এবং সরকারের প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ১০ জুন ২০২৫। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় থেকে দুই বছর আগে সাবস্টেশনের যন্ত্রপাতি এনে গুদামে রাখা হলেও দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ওই মালামাল এখনও পূর্ণমাত্রায় কার্যক্ষম রয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

একই অর্থবছরে ১০৩৭৪১০ নম্বর টেন্ডার আইডির মাধ্যমে ২৫০ কেভিএ জেনারেটর সরবরাহ ও স্থাপনের কাজেও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত এ কাজের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৬০৩ টাকা। মাত্র ৬.৮৫ শতাংশ কম দরে কাজটি দেওয়া হয় গেজ বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে।

একইভাবে ১২২০২৫৭ নম্বর ওটিএম আইডির মাধ্যমে ৬৩০ কেজি ধারণক্ষমতার একটি প্যাসেঞ্জার লিফট সরবরাহ ও স্থাপনের কাজ, ১১২৯৮৩৩ নম্বর টেন্ডারে প্রায় ২ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই সেট এসকেলেটর স্থাপন এবং ১১৯০০১৪ নম্বর টেন্ডারের মাধ্যমে আরও একটি ৬৩০ কেজি প্যাসেঞ্জার লিফট সরবরাহ ও স্থাপনের কাজও একই কৌশলে পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

এতেই শেষ নয়। সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের নামে তিন গ্রুপে ফায়ার এক্সটিংগুইশার সরবরাহ ও স্থাপন, ১০০০ কেজি ফায়ার কাম প্যাসেঞ্জার লিফট, ফোর্স ভেন্টিলেশন সিস্টেম, সোলার ও সার্জ প্রটেকশন সিস্টেম, বিশেষ আলোকসজ্জা, কম্পাউন্ড সিকিউরিটি লাইট, গার্ডেন লাইট, পাম্প মোটর সেট, সাউন্ড সিস্টেম, সিসিটিভি, পিএবিএক্স, ইন্টারকম, নেটওয়ার্কিং এবং প্রায় ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ভিআরএফ ও স্প্লিট টাইপ এয়ার কুলার সিস্টেমসহ একাধিক প্রকল্পের পুরো বরাদ্দের চেক ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রকল্পের মোটা অঙ্কের ঘুষের লেনদেন হয়েছে এবং মালামাল বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রকৌশলীই সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।

অভিযোগ রয়েছে, এসডিই রাজিয়া সুলতানা নিজের সাবডিভিশনে পার্সেন্টেজ বাণিজ্যের এক অঘোষিত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। ভুক্তভোগী অনেক ঠিকাদারের ভাষ্য, তার অধীনে কাজ পাওয়া মানেই মাঠে না গিয়েও কাজের অর্ধেক বা তারও বেশি অর্থ পার্সেন্টেজ হিসেবে দিতে হয়। এ কারণেই অনেকেই তাকে ব্যঙ্গ করে ‘তামজীদের সুলতানা’ নামে ডাকেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নভো থিয়েটারসহ বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছিল। একই সঙ্গে গণপূর্তের ই/এম-৫ বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী নামে-বেনামে কিংবা অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা তাদের নিকটাত্মীয় টেন্ডার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় যুক্ত থাকতে পারেন না। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, ই/এম-৫ বিভাগের একাংশ বছরের পর বছর এ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেন, এসডিই রাজিয়া সুলতানা, এসডিই সবুজ কুমার স্যানাল, উপসহকারী প্রকৌশলী সৌমেন মল্লিক, আবু সায়েম চৌধুরী, আব্দুল হান্নানসহ আরও কয়েকজন সেকশন কর্মকর্তা। এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের পিয়ন আনোয়ার, আরিফ ও হারুনের বিরুদ্ধেও নামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজিয়া সুলতানা প্রায় পাঁচ বছর এবং সবুজ কুমার স্যানাল প্রায় চার বছর ধরে একই দায়িত্বে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন এবং সে সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, কোনো কাজের কার্যাদেশ পাওয়ার পর তাদের ডেকে এনে বলা হতো—‘কাজ হয়ে গেছে, শুধু হিসাব করে টাকা দিয়ে যান, বিল সময়মতো হয়ে যাবে।’ অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিমূল্যের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত, আবার সেকশন কর্মকর্তা ও এসডিইদের পার্সেন্টেজ যোগ করে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ অর্থ আদায় করা হতো। পরে সামান্য কিছু কাজ করিয়ে কিংবা সীমিত পরিমাণ মালামাল কিনে বাকি অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের এই অনিয়মের মাধ্যমে অভিযুক্ত দুই এসডিই ঢাকায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টসহ নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘসময় নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে অবস্থান করায় অনেক ঠিকাদার নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পর্যন্ত সুযোগ পান না।

অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলীর পিয়ন আনোয়ার হোসেন প্রায় ১০ বছর ধরে একই দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলামের আপন ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বিভিন্ন লাইসেন্স ব্যবহার করে গত এক দশকে প্রায় দুই কোটি টাকার কাজ করেছেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে অফিসের অপর দুই পিয়ন আরিফ ও হারুনের বিরুদ্ধেও।

ডিভিশনের হিসাব সহকারী জাহাঙ্গীর হোসেন প্রায় ১৭ বছর ধরে একই পদে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের বিল যাচাইয়ের নামে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ গ্রহণের পাশাপাশি চেক ছাড় করার সময় চুক্তিমূল্যের প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত আদায় করা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত ই/এম-৫ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেনের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সরাসরি কথা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।

উল্লেখ্য প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যান্য অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ