ঢাকায় ৫৩টি ফ্ল্যাট, ১৫টি প্লট এবং শত শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগে আলোচনায় থাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা ড. সহিদুল ইসলামকে ঘিরে এবার উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজধানীর সম্পদের পাশাপাশি তার নিজ জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জেও প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে অনুসন্ধানকারী সংবাদমাধ্যম।
এর আগে গত ১ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাকায় সহিদুলের ৫৩টি ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। সেই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় নিজ এলাকায় খোঁজ নিয়ে আরও বিস্ময়কর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামজুড়ে জমি, কলেজ, ভবন—সম্পদের বিস্তার
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত চার বছরে মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিজ গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক হারে জমি কিনেছেন সহিদুল ইসলাম। বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি আধুনিক কলেজ, যার নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের ধারণা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনায় আরও জমি অধিগ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
এছাড়া মসজিদ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগেও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। যদিও স্থানীয়দের একাংশ এসবকে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—একজন সরকারি কর্মকর্তার এত বিপুল সম্পদের উৎস কী?
বাবার নামে অর্ধশত কোটি টাকার কলেজ
মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়নের ফুলহাতা গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে মোশারক হোসেন কলেজ। প্রায় ১৮ একর (১,৮০০ শতাংশ) জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটির বিশাল একাডেমিক ভবন, প্রশস্ত মাঠ এবং আবাসিক সুবিধা এলাকাজুড়ে আলাদা নজর কেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী—
. অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে অন্তত ৩৫ কোটি টাকা।
. জমি ক্রয় ও ভরাটে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
. যদিও এসব ব্যয়ের সরকারি কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
শিক্ষকতা না করেই মামা উপাধ্যক্ষ
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ২১ জন শিক্ষক রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, একদিনও শিক্ষকতা না করা সহিদুল ইসলামের মামা জাকির হোসেনকে কলেজের উপাধ্যক্ষ করা হয়েছে।
জাকির হোসেন বলেন, এলাকার শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যেই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং এতে কয়েকজন চিকিৎসক ও সরকারি কর্মকর্তারও সহযোগিতা রয়েছে। তবে অধিকাংশ অর্থ সহিদুল ইসলাম নিজেই ব্যয় করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
কলেজ পরিচালনায় ৫ কোটি টাকার এফডিআর
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ইসলামী ব্যাংকের মোরেলগঞ্জ শাখায় প্রায় ৫ কোটি টাকার এফডিআর রাখা হয়েছে। সেই আমানতের মুনাফা থেকেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের একটি অংশ পরিচালিত হয়।
নিজ ও স্ত্রীর নামে বিস্তীর্ণ জমি
অনুসন্ধানে পাওয়া দলিলপত্র অনুযায়ী, উত্তর ফুলহাতা মৌজায় সহিদুল, তার স্ত্রী, বাবা এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত কলেজের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, দলিলে থাকা জমির বাইরেও সহিদুলের প্রকৃত জমির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে তিনি ৮০ থেকে ৯০ বিঘা (প্রায় ২,৭০০ শতাংশ) জমি কিনেছেন।
হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনায় আরও জমি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কলেজের পাশেই ভবিষ্যতে একটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই কারণেই আশপাশের জমিগুলো ধীরে ধীরে কিনে নেওয়া হচ্ছে।
পৈতৃক বাড়ির চারপাশেও জমির বিস্তার
সহিদুল ইসলামের গ্রামের বাড়ির চারপাশেও গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ জমি কেনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, শুধু বাড়ির আশপাশেই প্রায় ৯০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৫ কোটি টাকারও বেশি।
খুলনা শহরেও রয়েছে বহুমূল্য বাড়ি
গ্রামের পাশাপাশি খুলনা শহরের ব্যাংকার্স লেন এলাকায়ও সহিদুল ইসলামের একটি বাড়ি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মামা জাকির হোসেন। স্থানীয়দের দাবি, ওই বাড়ি নির্মাণ বা ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে অন্তত ২০ কোটি টাকা।
মোট জমি ৫ হাজার ১৬৬ শতাংশ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চাকরিজীবনে সহিদুল ইসলাম নিজ এলাকায় মোট ৫ হাজার ১৬৬ শতাংশ জমি কিনেছেন। গড়ে প্রতি শতক ৪০ হাজার টাকা হিসাবে এর মূল্য ২০ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তবে বর্তমান বাজারদরে এই জমিগুলোর মূল্য আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
ঢাকায়ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ
এর আগে প্রকাশিত অনুসন্ধানে সহিদুল দম্পতির নামে ঢাকায় ৫৩টি ফ্ল্যাট, ১৫টি প্লটসহ কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা এবং বহুল আলোচিত ‘ছাগলকাণ্ড’-এর মতিউর রহমানের সহকর্মী।
বক্তব্য চাইলেও নীরব সহিদুল
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সহিদুল ইসলামের বাসায় গেলেও নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না। পরে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সম্পদ ও অনিয়মসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেননি এবং অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
