কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুব মহিলা লীগ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের বহু নেতা-কর্মী আত্মগোপনে গেলেও রাজধানীতে সংগঠনটির এক নেত্রীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নেপথ্যে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটির স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক আকলিমা আক্তার এষাকে ঘিরেই উঠেছে এসব প্রশ্ন। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা না গেলেও তিনি বর্তমানে রাজধানীতে অবস্থান করছেন এবং নেপথ্যে নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অতীতে সক্রিয় ছিলেন আকলিমা আক্তার এষা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকলেও নির্বিঘ্নে অবস্থান করছেন—এমন দাবি বিভিন্ন মহলের।
ব্যাংকের চাকরি, বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটি
একটি সূত্রের দাবি, আকলিমা আক্তার এষা বর্তমানে মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের মিরপুর শাখায় কর্মরত। সম্প্রতি এক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজধানীর মিরপুরের বাড়ি নং-৫৫/৫৬, রোড নং- ৫, ব্লোক- সি, সেকশন-৬, মিরপুর,ঢাকা বাবার বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। তবে তার বর্তমান অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রকাশ্যে নীরব, নেপথ্যে যোগাযোগের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও আকলিমা আক্তার এষা নেপথ্যে তার অনুসারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকার পরও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করার প্রচেষ্টার সঙ্গেও তার নাম বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
‘নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা হলে নির্বিঘ্নে চলাফেরা কীভাবে?’
এদিকে আকলিমা আক্তার এষার মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের কেউ কেউ যদি নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কী—এ প্রশ্নও উঠেছে।
সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা কীভাবে প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন? তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ কেন দেখা যাচ্ছে না?
অভিযোগকারীদের মতে, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
‘দল গোছানোর’ অভিযোগ, বাড়ছে রাজনৈতিক অস্বস্তি
সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেটির নাম ব্যবহার করে নতুন করে সাংগঠনিক তৎপরতা, বিশৃঙ্খলা, নাশকতা কিংবা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কেউ যদি গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনগত পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রকাশিত সংবাদে আকলিমা আক্তার এষার নাম উঠে আসার পরও তার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সদস্য বা নেতা-কর্মী আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড, নাশকতা কিংবা গোপন সাংগঠনিক তৎপরতায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আকলিমা আক্তার এষার বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো প্রকাশ্য গ্রেপ্তার বা দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ছাত্রলীগ থেকে যুব মহিলা লীগ
আকলিমা আক্তার এষা অতীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ার পর প্রকাশ্য রাজনীতিতে তার উপস্থিতি না থাকলেও রাজধানীতে অবস্থান এবং নেপথ্যে যোগাযোগের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—নিষিদ্ধ সংগঠনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক কি আদৌ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, নাকি আড়ালে চলছে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা?
এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুসন্ধান ও নিরপেক্ষ তদন্তেই।
উল্লেখিত প্রতিবেদনে নেপথ্যে যোগাযোগ, দল গোছানো বা সাংগঠনিক তৎপরতার অভিযোগগুলো বিভিন্ন সূত্রের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য। আকলিমা আক্তার এষার বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
