সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) জি এম নজরুল ইসলামকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, দ্বিতীয় স্ত্রীর বৈবাহিক পরিচয় গোপন রেখে তাঁর জন্য চাকরির জোর সুপারিশ করেছেন ৭৪ বছর বয়সী এই সংসদ সদস্য।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ জুন তিনি ১৮ বছর বয়সী মরিয়ম বেগমকে তিন লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে করেন। বিয়ের মাত্র পাঁচ দিন পর, ২২ জুন, মরিয়মের একটি জীবনবৃত্তান্তে চাকরির জন্য সুপারিশ করেন। তবে ওই জীবনবৃত্তান্তে মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা উল্লেখ করা হয় ‘অবিবাহিত’ হিসেবে, যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
গোপন ভিডিও ঘিরে তোলপাড়
গত ১৩ জুলাই রাজধানীর মগবাজারে এমপি নজরুল ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর একান্ত সময়ের একটি গোপনে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক এমপিকে ঘিরে নানা প্রশ্ন করছেন। এ সময় তিনি বলেন, আমি এই প্রথম এসেছি।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুরুতে জামায়াতের কিছু সমর্থক ভিডিওটিকে ভুয়া দাবি করলেও, পরে এমপি নিজেই ভিডিওটি আসল বলে স্বীকার করেন এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
দলের অবস্থান
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহছানুল মাহবুব যোবায়ের এক বিবৃতিতে জানান, বিষয়টি দল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাবিননামায় যা জানা গেল
ভিডিও প্রকাশের পর এমপি নজরুল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা প্রকাশ করেন। এতে দেখা যায়—
বিয়ের তারিখ: ১৭ জুন
স্থান: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন
দেনমোহর: ৩ লাখ টাকা
কনের বয়স: ১৮ বছর ১ মাস
বর-কনের বয়সের পার্থক্য: ৫৭ বছর
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন এমপির প্রথম স্ত্রী বেগম মাকসুদা ইসলাম।
প্রথম স্ত্রীর বক্তব্য
এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তাঁর সম্মতিতেই দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে। পাশাপাশি তিনি তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
দ্বিতীয় স্ত্রীর ব্যাখ্যা
মরিয়ম বেগম দাবি করেন, চাকরির জন্য যে জীবনবৃত্তান্তটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি বিয়ের আগেই তৈরি করা হয়েছিল। পরে তাঁর স্বামী তাতে স্বাক্ষর করেন। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো বেসরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন।
নিজের চেয়ে ৫৭ বছর বড় একজনকে বিয়ে করার বিষয়ে মরিয়ম বলেন, এটি তাঁর নিজের ইচ্ছা এবং পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছে।
ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
এমপির ব্যক্তিগত সহকারী আবুল হাসান দাবি করেন, মগবাজারে অবস্থানের সময় মরিয়মের মামা ওবায়দুল্লাহ গোপনে কক্ষে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণ করেন। পরে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এসে এমপিকে হেনস্তা করে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩ লাখ টাকা দেওয়ার পরও বাকি টাকা না পেয়ে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে এমপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন।
এমপির বক্তব্য
জি এম নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি দুই স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে মরিয়মের বাবার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থানের সময় কয়েকজন ব্যক্তি কক্ষে ঢুকে তাঁদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করে এবং ভাড়ার গাড়িও আটকে রাখে। তাঁর অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জেরেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু
ঘটনাটি এখন দুই কারণে আলোচনায় রয়েছে—
দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিচয় গোপন রেখে চাকরির সুপারিশের অভিযোগ, যা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছে।
ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপন ভিডিও প্রকাশ, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিকতার বিতর্কও সামনে এনেছে।
এ ঘটনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।
