বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যেন থামছেই না। অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরে অনিয়মের সংস্কৃতি চালু রেখেছেন তিনি।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন (আসবাবপত্র)’ প্রকল্পের আওতায় ৬০টি কাজের মধ্যে অন্তত ২৯টি কাজের ২১টি প্রকল্প ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে মেসার্স মা কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ নির্ধারিত সময় পার হলেও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, বানারীপাড়া, উজিরপুর, মুলাদী, মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে কোটি কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হলেও অনেক প্রকল্পে কাজ শেষ হয়নি কিংবা অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। বিভিন্ন টেন্ডার আইডি, কার্যাদেশের তারিখ, চুক্তিমূল্য ও কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলেও বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বরিশালে যোগদানের পর থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল ছাড়, জামানতের চেক পরিশোধসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির নেটওয়ার্ক সচল রাখতে তিনি ঢাকাস্থ সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং প্রতি সপ্তাহে ইলিশ পাঠাতেন—এমন দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
শিক্ষা প্রকৌশল সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অসাধু প্রকৌশলী-ঠিকাদার সিন্ডিকেটের কারণে জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগ, নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার প্রায় সব বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং পরে উচ্চমূল্যে অন্য ঠিকাদারদের কাছে কাজ বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
তথ্যসূত্রে আরও জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশিকুর রহমানের নামও বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই দুজনের সমন্বয়ে দপ্তরে ঘুষ, কমিশন ও অনিয়মের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছে। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দপ্তরের দুই কর্মকর্তা দাবি করেন, বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ৭ থেকে ৮ জনের একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাদের ভাষ্য, নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় এসব ঠিকাদার বড় বড় প্রকল্প পেয়েছেন এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন দিয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে নিজেকে জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিলেও অতীতে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ২৭ জুলাই ২০২২ ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে কোনো ধরনের দুর্নীতি-অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। অভিযোগ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, সপ্তাহাধিক আগে এমন আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।
