সোমবার, ১৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলালকে ঘিরে বিতর্ক, পদায়ন নীতিমালা লঙ্ঘন, বদলি–পদোন্নতিতে আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের অভিযোগ

আবদুর রহমান
আগস্ট ১৭, ২০২৬ ৩:৪২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, পদোন্নতি ও বদলি-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। এরই মধ্যে পদায়ন নীতিমালা লঙ্ঘন করে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিজ জেলায় পদায়নের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এলজিইডির ইতিহাসে এমন পদায়ন নজিরবিহীন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ওই পদায়নের পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। নানা বিতর্কের মধ্যেই মেয়াদ শেষে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

জানা গেছে, মো. বেলাল হোসেন ১৯৯২ সালে এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী পদে উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুই সরকারের আমলেই তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্যের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। জেলার কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, চাকরিবিধির কারণে তারা প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে পারছেন না। তাদের দাবি, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জেলাভেদে বদলির ক্ষেত্রে ২০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৬ জুলাই প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তার নিজ জেলায় পদায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়নের প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্থানীয় সরকার বিভাগের বদলি ও পদায়ন বিধিমালার ১(ক) ও ১(ঙ) অনুচ্ছেদে মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ, বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কোনো কর্মকর্তাকে তার নিজ জেলা কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর জেলায় পদায়নের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই বিধি উপেক্ষা করেই জাহানারা পারভীন নামের ওই নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদায়ন করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। তার স্বামী ঠিকাদার শামছুল বারী একই গ্রামের আবদুল আজিজের ছেলে। এই পদায়নের পেছনে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি ৪১ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদায়ন ও বদলিকে কেন্দ্র করেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

এক আদেশ, দুই বদলি—নেপথ্যে কী?

পদ্মার পশ্চিম পাড়ের একটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী বদলি নিয়েও সম্প্রতি ঘটে নাটকীয় ঘটনা। গত ৬ জুলাই প্রথমে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ওই জেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি কর্মস্থলে যোগদানের আগেই সেই আদেশ বাতিল করা হয়। পরে ১৬ জুলাই নতুন করে অন্য একজনকে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রথমে যাকে বদলি করা হয়েছিল তিনি কথিত চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিতে না পারায় তাকে সেখানে যোগদান না করতে বলা হয়। চাকরির নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দুজনের নাম প্রকাশ করা হয়নি। এ ধরনের আরও একাধিক বদলির ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন।

বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদোন্নতি হয় কমিটির সুপারিশে এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। জেলা-উপজেলায় ফ্যাসিস্ট সরকারের কিছু সহযোগী অথবা সরকারের উন্নয়ন কাজে অসহযোগী কিছু লোক থাকতে পারে। তাদের বদলি করা হলে তারা এ ধরনের অভিযোগ তুলতেই পারে।

আত্মীয়তার অভিযোগ, বন্ধুত্বের ব্যাখ্যা

এলজিইডি ঢাকা জেলার দায়িত্বে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রধান প্রকৌশলীর নিকট আত্মীয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বেলাল হোসেন বলেন, ‘একজন নির্বাহী প্রকৌশলী আমার বন্ধু। অফিস সময়ের পর তার সঙ্গে আড্ডা দেই। এ জন্য কিছু লোক এ ধরনের অভিযোগ দাখিল করতে পারে।

সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার আগে নির্বাহী প্রকৌশলী প্রশাসনসহ বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে প্রকল্প থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। একই সঙ্গে ঢাকা ও নিজ জেলায় তার বিপুল সম্পদের তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—রংপুর সার্কিট হাউসের সামনে প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ, রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দুটি ফ্ল্যাট, রংপুর মেডিকেল কলেজের পেছনে প্রায় ১০ বিঘা জমি এবং কুড়িগ্রামে প্রায় ৭০ বিঘা কৃষিজমি কেনা।

রংপুর সার্কিট হাউসের বিপরীতে রোড-০১, বাড়ি-১৯ নম্বর ভবনটি নিজের বলে স্বীকার করেছেন প্রধান প্রকৌশলী। তার দাবি, বিদেশে থাকা এক ভাইয়ের অর্থে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে তিনি বলেন, বাড়িটি আমার। আমার আয়কর বিবরণীতে যা আছে, সেটিই আমার সম্পদ।

বসুন্ধরায় প্লট থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, বসুন্ধরায় আমার কোনো কিছু নেই। আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত সম্পদ ছাড়া আমার কোনো সহায়-সম্পদ নেই।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বরাবর দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বেলাল হোসেন ছাত্রজীবনে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রধান প্রকৌশলী পদে আসেন—এমন দাবিও করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান প্রথমদিকে তাকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদায়নের বিষয়ে নেতিবাচক ছিলেন। পরে ইসলামী আদর্শের একটি রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তির সুপারিশে বেলাল হোসেনকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

তবে নিজের পদোন্নতি ও নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বেলাল হোসেন বলেন, আমার পদোন্নতি ও নিয়োগ হয়েছে এনএসআই, এসবি, দুদক ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট, চাকরির রিপোর্ট এবং এসিআরের ভিত্তিতে। এসব হয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে শক্তিশালী এসএসবি কমিটির মাধ্যমে। কেউ ইচ্ছা করলেই তার পদোন্নতি হয় না।

চলতি দায়িত্বেও কোটি টাকার অভিযোগ

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার পদায়ন ও চলতি দায়িত্ব প্রদান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির প্রশাসন শাখার তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চে ৯০ জন কার্যসহকারীকে সার্ভেয়ার (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা করে মোট ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ১৩৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে মোট ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব কাজে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ও তার গাড়িচালক প্রধান প্রকৌশলীকে সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বেলাল হোসেন বলেন, সার্ভেয়ার ও সহকারী প্রকৌশলীদের চলতি দায়িত্ব প্রদান একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কাউকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হওয়ার পরই সহকারী প্রকৌশলীদের চলতি দায়িত্ব প্রদানের অনুমোদন দিয়েছে।

৯০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৫০ কোটি কমিশনের অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পেও প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

অভিযোগের বিষয়ে বেলাল হোসেন বলেন, আমি পিডি থাকাকালীন এই ব্রিজের ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি। ২০ শতাংশের মতো নিম্ন দরে কাজ নেওয়ায় ঠিকাদার নিজেই কাজটি করতে অনাগ্রহী ছিল। ঠিকাদার নিয়োগ আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার অনুমোদনে হয়েছে।

এলকেএসএস প্রকল্পে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এই প্রকল্পে নিয়োগের টেন্ডার হয়েছে পিডি অফিস থেকে।

অভিযোগের পাহাড়, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

এলজিইডির মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ওঠায় দপ্তরটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, নিজ জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়ন, চলতি দায়িত্ব প্রদানে আর্থিক অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিপুল সম্পদের অভিযোগ—সব মিলিয়ে বেলাল হোসেনের দায়িত্বকাল এখন কঠিন প্রশ্নের মুখে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে কোন অভিযোগের পেছনে বাস্তবতা রয়েছে আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মেয়াদ শেষে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দৌড়ঝাঁপের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কার্যকর তদন্ত হবে কি না, সেটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

তবে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর অধিকাংশই অস্বীকার করেছেন প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।