ক্ষমতার পালাবদলে ‘বিএনপি বান্ধব’ সাজার দৌড়ঝাঁপ, ঢাকার লোভনীয় চেয়ার থেকে চট্টগ্রামে—টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও নিয়োগ-বাণিজ্যের নানা অভিযোগ। ফাইল ছবি
ক্ষমতার পালাবদল হলেই যেন বদলে যায় পরিচয়, বদলে যায় রাজনৈতিক সুর! লালফিতার প্রশাসনে এমন ‘বহুরূপী’ চরিত্রের গল্প নতুন নয়। তবে গণপূর্তের প্রকৌশলী মো. মহিবুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ যেন সেই পুরোনো গল্পকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এই প্রকৌশলী এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে ‘বিএনপি বান্ধব’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে ওঠা অতীতের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ এখনো রয়ে গেছে অমীমাংসিত।
আট বছর ‘লোভনীয়’ চেয়ারে, অভিযোগের পাহাড়
জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (E/M) শাখায় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন প্রকৌশলী মহিবুল ইসলাম।
ই/এম বিভাগ-৭ ও ১৩ হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সচিবালয়সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ ই/এম বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রভাবশালী ঠিকাদারদের একটি বলয় তৈরি করেন এবং সরকারি কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
সাধারণ ও প্রতিযোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ—দরপত্রের সময়সূচি ও প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিচালনার চেষ্টা করা হতো, যাতে পছন্দের ঠিকাদার বা সিন্ডিকেট সুবিধা পায়। এমনকি সোমবার টেন্ডার জমার তারিখ নির্ধারণের মতো কৌশল ব্যবহার করে প্রতিযোগীদের মাঠের বাইরে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারি চেয়ার, নেপথ্যে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট?
প্রকৌশলী মহিবুলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বনামে-বেনামে ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার।
অভিযোগে ‘ইউনিভার্সেল এন্টারপ্রাইজ’-এর নামও উঠে এসেছে। সমালোচকদের দাবি, সরকারি পদে থেকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সরকারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার কাজ টেন্ডার ছাড়াই সম্পন্ন করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে তৎকালীন কর্তৃপক্ষের অসন্তোষের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং সরকারি তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আউটসোর্সিংয়ে ‘চাকরি-বাণিজ্য’র অভিযোগ
শুধু টেন্ডার নয়—আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রকৌশলী মহিবুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার মাধ্যমে জনবল সরবরাহকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার বাণিজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল।
‘উইডু’র মতো বৈধ ও সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিতে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষার্থীদের ঢাকায় এনে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ।
গণমাধ্যমের নজরে আসার পর বদলি
অভিযোগ রয়েছে, গণমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ ও সমালোচনা বাড়তে থাকায় ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রকৌশলী মহিবুল ইসলামকে চট্টগ্রাম গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-২-এ বদলি করা হয়।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি হলেও তার প্রভাব-প্রতিপত্তির আকাঙ্ক্ষা থেমে নেই। বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন তিনি।
প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের রং বদলালেই কি অতীতের অভিযোগ মুছে যায়?
গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব নিরূপণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহিবুলের বক্তব্য কী?
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী মো. মহিবুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
উল্লেখ্য যে, দুদকের নজরে মহিবুল। সঠিক নথি তদন্তে মিলবে কোটি কোটি টাকার গড়মিল। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………
