ঢাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় উসকানি ও মদদের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে। ফাইল ছবি
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, নির্যাতনে উসকানি ও মদদ দেওয়ার অভিযোগে ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকসহ আটজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই সঙ্গে মাকসুদ কামাল ও ড. জাফর ইকবালসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মাকসুদ কামাল ও জাফর ইকবাল ছাড়া অভিযোগপত্রে থাকা অন্য ছয়জন হলেন—আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন এবং সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত।
এর মধ্যে সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ড. জামাল উদ্দিন ও তানভীর হাসান সৈকত বর্তমানে অন্য মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে বাকি আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
পলাতক আসামিদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান মানবতাবিরোধী অপরাধের অপর একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
১৬ সেপ্টেম্বর দাখিল হয় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল-১-এ আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম বলেন, ‘তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ বেশ কিছু লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা এবং পুলিশের হামলার জন্য উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। তারা ষড়যন্ত্র করেন, অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা (অ্যাটেম্পট) ও মদদ (অ্যাবেটমেন্ট) দেন। এই অভিযোগে আমরা একটি ফরমাল চার্জ দাখিল করেছি।
আসামিদের নামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এখনো ট্রাইব্যুনালে এটার শুনানি হয়নি এবং কিছু আসামি পলাতকও আছেন, তাই আমরা সব আসামির নাম বলতে চাচ্ছি না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি মাকসুদ কামালসহ মোট আটজনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
শিক্ষক ও অন্যান্য আসামিদের ভূমিকার বিষয়ে প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম বলেন, ‘কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো—১৪ জুলাই শেখ হাসিনা যখন আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বা ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, তারপর তারা এই বক্তব্যটাকে বহন করে (ক্যারি আউট) তাদের অধীনস্থদের (সাব-অর্ডিনেট) দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালান। শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথন করে ছাত্রদের হত্যা ও নির্যাতন করার ষড়যন্ত্রও করেন তারা।
৬ আগস্ট জমা পড়ে তদন্ত প্রতিবেদন
এর আগে গত ৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রসিকিউশন টিম তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাই-বাছাই (স্ক্রুটিনি) করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুত করে।
কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
দাখিল করা অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কে এম জামাল উদ্দিন এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। মামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও আসামি হতে পারেন বলে জানা গেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, গত ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা এবং হামলাকারীদের পরোক্ষ মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ঢাবি শিক্ষক কে এম জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি সশস্ত্র হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে সাবেক মন্ত্রী, আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে এই প্রথম কোনো তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আজকের আদেশের মধ্য দিয়ে এখন ওই আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
