মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজধানীর মাদক বাণিজ্যে ভয়ংকর চিত্র, মাদক ব্যবসায় যুক্তদের ২৭.৪ শতাংশই ১৫ বছর বা কম বয়সী শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ৫, ২০২৬ ১১:৩৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

রাজধানীর মাদক বাণিজ্যে ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে পড়ছে শিশুরা। ঢাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ২৭ দশমিক ৪ শতাংশই ১৫ বছর বা এর কম বয়সী। অর্থাৎ মাদক বেচাকেনার অন্ধকার জগতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুরের দিকে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় এক কিশোরকে ছয় কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাও এ বাস্তবতারই যেন আরেকটি উদাহরণ। গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সন্দেহ হওয়ায় বছিলা চেকপোস্টে অটোরিকশাটি থামিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় কিশোরটির সঙ্গে থাকা ট্রাভেল ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ গাঁজা। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শুধু ওই কিশোর নয়, রাজধানীতে মাদক ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগে মাঝেমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

ঢাকার মাদক ব্যবসা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের করা গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। ‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি গত ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী পিএলওএস ওয়ানে প্রকাশিত হয়।

ঢাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এক হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

শিশুদের টানছে মাদক সিন্ডিকেট

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের অভাব একটি বড় কারণ। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে জবরদস্তির তথ্যও উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই আর্থসামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই রাস্তায় থাকতেন কিংবা গৃহহীন ছিলেন।

অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ২৬ দশমিক ৭ বছর। তাদের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত বা তার নিচে। প্রায় ২৯ শতাংশ ফুটপাতে বসবাস করতেন। আরও প্রায় ১০ শতাংশ নিজেদের গৃহহীন বা ভাসমান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেশাদার যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা এর কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ইয়াবা বিক্রিতে সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। হেরোইন বিক্রিতেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রির প্রবণতা বেশি। যৌন পেশায় যুক্ত নারীদের মধ্যে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বেশি পাওয়া গেছে। অন্য নারীদের ক্ষেত্রে হেরোইন ও গাঁজা বিক্রির হার তুলনামূলক বেশি।

কেন মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছে শিশুরা?

মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার কারণ জানতে গিয়ে গবেষণায় শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে কর্মসংস্থানের অভাব। নারীদের ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের অভাবকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক মাদক ব্যবসায় যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবকে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান গবেষক ড. শাফায়াত হোসেন বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ২৮ শতাংশ ১৫ বছর বা কম বয়সী—এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি নির্দেশ করে, ঢাকার মাদক বাণিজ্যের কাঠামোতে শিশুশ্রমের মতো অপরাধমূলক শিশু-শোষণ গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে।

তিনি বলেন, ১৫ বছর বা তার কম বয়সীরা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ থেকে দূরে থাকে। তাই মাদক সিন্ডিকেটগুলো এই বয়সসীমার শিশুদের জোর করে বা কৌশলে ব্যবহার করছে। এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সরাসরি প্রতিচ্ছবি।

ঢাকার কোন এলাকায় কোন মাদক?

গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির ধরনেও পার্থক্য পাওয়া গেছে।

এক হাজার ১৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তাদের উপস্থিতি বেশি ছিল পল্টন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়।

২৮৫ জন শুধু ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডায় বেশি উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ২২৮ জন গাঁজা ও ইয়াবা—দুটোই বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তারা মূলত ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকায় বেশি বিক্রি করেন।

আর গাঁজা ও হেরোইন—দুটোই বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ২৫০ জন। তাদের সাভার ও পল্টনে বেশি দেখা গেছে।

ঢাকায় ঢুকছে মাদক, রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক রুট

গবেষণায় হেরোইন, গাঁজা ও ইয়াবা ঢাকায় পৌঁছানোর কয়েকটি রুটও চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, হেরোইন মূলত পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনা এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে আসে। পরে ঢাকায় প্রবেশ করা হেরোইন সাভার, মিরপুর, মহাখালী, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

গাঁজা ঢাকায় প্রবেশের দুটি প্রধান রুটের কথা বলা হয়েছে। একটি ভারত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে, অন্যটি কুমিল্লা হয়ে। দুটি রুটই ঢাকায় এসে মিলিত হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে গাঁজা।

ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। টেকনাফ সীমান্ত ছাড়াও ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর একাধিক রুটে সিলেট ও সুনামগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসে।

গবেষণায় মিয়ানমার থেকে মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে আসা ইয়াবার রুটকে বৃহত্তর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ মাদক পাচার নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব পথে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলের উৎপাদনকেন্দ্র থেকে সরাসরি ঢাকার বাজারে মাদক প্রবেশ করে।

এ ছাড়া ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আরও কয়েকটি রুটের কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ।

গবেষণার মানচিত্রে তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত রুট আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। এগুলো হলো—পাকিস্তান-লাহোর-ওয়াঘা-পাটনা-বাংলাদেশ; ভারত-মিজোরাম-মেঘালয়-বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার-টেকনাফ-ঢাকা।

গবেষণার সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করেছেন গবেষকরা

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বাছাইয়ে ‘পারপাসিভ’ ও ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়নি।

অবৈধ ও গোপন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে গবেষকরা পরিচিত ব্যক্তি ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সংগ্রহ করেছেন। ফলে গবেষণার ফলাফলকে পুরো ঢাকা শহরের মাদক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষণা কেন্দ্র এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইনফরমেশন সেন্টারের গবেষক অধ্যাপক গ্যারেথ হল্যান্ড, সৌদি আরবের ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিক গবেষণা-সংক্রান্ত বিভাগের ডিন অধ্যাপক মো. আলামিন, চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান, ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাহদী হাসান এবং সিরাজগঞ্জের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার।

গবেষণার এই চিত্র বলছে, ঢাকার মাদক বাণিজ্য শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, গৃহহীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শিশুদের অপরাধী চক্রে ব্যবহারের মতো গুরুতর সামাজিক সংকট। বিশেষ করে ১৫ বছর বা কম বয়সী শিশুদের ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ অংশগ্রহণের তথ্য রাজধানীর মাদক নিয়ন্ত্রণ ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।