শনিবার, ১০ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজধানীতে দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচার অভিনব ফাঁদ

সমতল মাতৃভূমি ডেস্ক
অক্টোবর ১০, ২০২৬ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

হাসপাতালের দেয়ালে প্রচারণা, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন; আলিশান অফিসে চলছে ‘ব্রোকারেজ’, জড়িত একাধিক চক্র। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে দত্তকের আড়ালে শিশু কেনাবেচার অভিনব ফাঁদ পেতেছে একাধিক অসাধু চক্র। হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, এমনকি আলিশান অফিস খুলেও চলছে শিশু দত্তক দেওয়ার নামে অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে হাসপাতালের কর্মচারী, নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরাও জড়িত। সন্তানহীন দম্পতিদের আবেগ ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এসব চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাদ্যে ভেজালসহ নানা কারণে বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন অনেকে। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমসহ (পিসিওএস) বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান নিতে পারছেন না অনেক দম্পতি। সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষায় থাকা এসব মানুষকেই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে চক্রগুলো। দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে নিজেদের মধ্যস্থতাকারী বা ব্রোকার হিসেবে পরিচয় দেয় তারা। এরপর চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শিশু সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ছেলে শিশু চাইলে ছেলে, মেয়ে শিশু চাইলে মেয়ে—চক্রগুলোর কাছে নাকি চাহিদামতো শিশুর ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছেলে শিশুর জন্য তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা এবং মেয়ে শিশুর জন্য দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আর মধ্যস্থতাকারীরা কমিশন হিসেবে পান ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

শিশু হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি স্ট্যাম্পে দাতা ও গ্রহীতার নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে এফিডেভিট এবং নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করার কথাও জানা গেছে। তবে এ ধরনের কাগজপত্র তৈরি করলেই শিশু কেনাবেচা বৈধ হয়ে যায় না। বরং শিশুর নিরাপত্তা, অভিভাবকত্ব এবং প্রযোজ্য আইন মেনে দত্তক বা বিকল্প পরিচর্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

শুধু ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুই নয়, গর্ভে থাকা অবস্থায়ও শিশুকে অন্যের কাছে দেওয়ার চুক্তি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের দেখভাল, চিকিৎসা এবং প্রসবের খরচ বহনের বিনিময়ে সন্তান জন্মের পর তাকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ফেসবুকে ‘ছেলে বাচ্চা চাই’, ‘মেয়ে বাচ্চা চাই’—খোলামেলা পোস্ট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাচ্চা বেচাকেনা’, ‘বাচ্চা দত্তক দিচ্ছি’ কিংবা ‘বাচ্চা দত্তক নিচ্ছি’ লিখে অনুসন্ধান করলেই অসংখ্য পেজ ও গ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব পেজ ও গ্রুপে দত্তক দেওয়ার কথা বলে শিশু চাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের শিশুর ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কোনো কোনো পোস্টে লেখা হচ্ছে, ‘আর্জেন্ট একটি ছেলে বাচ্চা লাগবে’। আবার কেউ লিখছেন, ‘একটি মেয়ে বাচ্চা চাই’। এসব পোস্টের মন্তব্যের ঘরে শিশুর বয়স জানতে চাওয়া হচ্ছে। উত্তরে কেউ তিন বছর বয়সী শিশুর কথা বলছেন, কেউ আবার সাত মাসের শিশুর ব্যবস্থা থাকার দাবি করছেন। এমনকি নির্দিষ্ট মাস উল্লেখ করে নবজাতক ছেলে শিশুর চাহিদা জানিয়ে যোগাযোগের আহ্বানও দেখা যাচ্ছে।

এসব পোস্টের নিচে আগ্রহীরা শিশুর বয়স জানতে চাইছেন, আবার কেউ সরাসরি ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলছেন। কোথাও কোথাও চাহিদা অনুযায়ী শিশু দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও কথোপকথন চলছে। ফলে দত্তক দেওয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘ভালো পরিবার আছে, সন্তান হবে না’—আবেগকে পুঁজি করার কৌশল

এমনই ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে যোগাযোগ করে মানবজমিন। সেখানে পরিচয় গোপন রেখে ‘অনন্যামাউস’ নামে একটি আইডি থেকে সদ্য প্রকাশিত পোস্টে লেখা হয়, ‘একটা বেবি দত্তক লাগবে। ভালো ফ্যামিলি আছে, তাদের সন্তান হবে না, তাই দত্তক নিতে চাচ্ছে কিন্তু পাচ্ছে না। বাচ্চার কোনো কিছুর অভাব হবে না ইনশাআল্লাহ।’

পোস্টটি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ঐশ্বর্য চৌধুরী ওরিন’ নামে একটি আইডি থেকে মন্তব্য করা হয়, ‘ছেলে হবে’। জবাবে পোস্টদাতা শিশুর বয়স জানতে চাইলে ওই আইডি থেকে বলা হয়, ‘তিন বছর’।

একই পোস্টের মন্তব্যে ‘সানজিদা সীমা’ নামে আরেকজন ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলেন। অন্যদিকে ‘হ্যান্ডসাম ক্রোকোডাইল-৮৯৯’ নামে একটি আইডি থেকে জানতে চাওয়া হয়, ‘ডিমান্ড করলে কি দেয়া পসিবল’। জবাবে পোস্টদাতা সম্মতিসূচক উত্তর দেন। পরে ওই আইডি থেকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চাওয়া হয়।

এই কথোপকথন দত্তকের নামে শিশু সরবরাহের প্রস্তাব কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, তার একটি উদাহরণ। তবে এসব আইডির পরিচয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত ভূমিকা এবং অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দত্তকের আড়ালে শিশু বাণিজ্যের ঝুঁকি

শিশুকে অর্থের বিনিময়ে পণ্যের মতো লেনদেন করার অভিযোগ শুধু অনৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে শিশুর নিরাপত্তা, পরিচয়, অভিভাবকত্ব এবং সম্ভাব্য শোষণের গুরুতর ঝুঁকিও জড়িত। দত্তকের নামে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হলে শিশুর জন্মপরিচয় গোপন, জাল কাগজপত্র তৈরি কিংবা শিশুকে অনিরাপদ পরিবেশে হস্তান্তরের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানহীন দম্পতির আবেগকে পুঁজি করে কেউ যাতে অবৈধ সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য এ ধরনের অনলাইন পেজ ও গ্রুপের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালকেন্দ্রিক প্রচারণা, সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী এবং অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দত্তক বা বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দত্তকের নামে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।