পৌর মার্কেট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী, ড্রেন থেকে সড়কবাতি—বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, নাগরিক সেবায় চরম ভোগান্তি, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি। ফাইল ছবি
মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে নাগরিক সেবা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পৌর মার্কেট নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ড্রেন নির্মাণে অনিয়ম, সড়ক সংস্কারে দায়সারা কাজ, মশা নিধনের ওষুধ ছিটানোয় গাফিলতি এবং নাগরিক সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী শামীম রেজা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সময়ে অনুমোদিত শতকোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে তাঁর তদারকিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজের মান, অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে উঠেছে একের পর এক প্রশ্ন।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কথিত স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পৌরসভার কার্যক্রমে জবাবদিহি কমে গেছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বদলায়নি পৌরসভার চিত্র?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তী সময়ে পৌরসভার প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রমের দায়িত্ব বর্তায় প্রধান প্রকৌশলী শামীম রেজাসহ অন্যান্য কর্মকর্তার ওপর।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। কিন্তু অভিযোগ, বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং পূর্ববর্তী সময়ে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, অর্থ ব্যয় ও কাজের মান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের একটি অংশ নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) একাধিক দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হওয়ায় পৌরসভার কার্যক্রমে কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারি ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পৌর মার্কেট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
গাংনী পৌর মার্কেট নির্মাণকাজ ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মার্কেট নির্মাণে নিম্নমানের সিমেন্ট, পাথর, বালু ও রড ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণে যথাযথ তদারকির পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি বা আর্থিক লেনদেনের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া না গেলে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এদিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের স্থানে প্রকল্পের নাম, অনুমোদিত ব্যয়, কাজের মেয়াদ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, নকশা ও প্রাক্কলনসংক্রান্ত তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা। কিন্তু পৌর মার্কেট নির্মাণস্থলে এসব তথ্যের সাইনবোর্ড না থাকার অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের বিবরণ জনসাধারণের কাছে দৃশ্যমান না থাকায় উন্নয়নকাজের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
৪.৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ: প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
গাংনী পৌরসভার ড্রেন নির্মাণকাজ নিয়েও উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ। গাংনী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় ৪.৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের বাকি কাজ গাংনী পৌরসভা বাস্তবায়ন করেছে।
তবে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের বক্তব্যে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের কাজের প্রকৃত অগ্রগতি, অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব এবং নির্মাণের মান যাচাই করা প্রয়োজন।
ড্রেন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। তবে প্রকল্পের মূল নথি, কার্যাদেশ, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার ও সরেজমিন পরিমাপ যাচাই করে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নাগরিক সেবায় ভোগান্তি: মশা, ময়লা ও ভাঙাচোরা সড়ক
পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি নাগরিক সেবা নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মশা নিধনের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ যথাযথভাবে ছিটানো হচ্ছে না। ফলে রাস্তার দুই পাশের ঝোপঝাড় ও ড্রেনগুলো মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অপরিচ্ছন্ন স্থানে মাদকসেবী ও অপরাধীদের আড্ডা জমে উঠছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কে রাতের আঁধারে দায়সারাভাবে নিম্নমানের কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করার অভিযোগ উঠেছে। সড়ক সংস্কারের পর অল্প সময়ের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্যানিটেশন প্রকল্পে অনিয়ম, পানির সংযোগ ছাড়াই বিল
স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগীদের নির্ধারিত মোটর ও পানির ট্যাংক সরবরাহ করা হয়নি। উল্টো কিছু সুবিধাভোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে পৌরসভার সরবরাহ করা পানি অনেক বাড়িতে পৌঁছায় না বলে অভিযোগ থাকলেও নিয়মিত পানির বিল দেওয়া হচ্ছে। এতে সেবা না পেয়েও বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সড়কবাতি বিকল, ফুটপাত দখল ও পরিবেশ বিপর্যয়
পৌর এলাকার অধিকাংশ স্থানে সড়কবাতি বিকল হয়ে পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত আলোর অভাবে সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
পৌর বাজারের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কের ওপর অবৈধভাবে দোকানপাট বসিয়ে জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব দোকান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে, যা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
এদিকে পলিথিন, ডাবের খোসা ও ময়লা-আবর্জনায় পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান নোংরা হয়ে পড়েছে। ড্রেনের ওপর টিনের শেড ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ফুটপাত দখলের অভিযোগও রয়েছে। এতে পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে এবং নগরীর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নাগরিক সনদ থেকে জন্মনিবন্ধন—সেবা পেতে ভোগান্তি
পৌরসভার প্রশাসনিক সেবা পেতেও সাধারণ মানুষকে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাগরিক সনদ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, উত্তরাধিকার (ওয়ারিশ) সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানির অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে সেবা না পাওয়ায় অনেককে বারবার পৌরসভায় যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে, পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
তদন্তের দাবি সচেতন নাগরিকদের
গাংনী পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও নাগরিক সেবা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
তাঁদের দাবি, পৌর মার্কেট ও ড্রেন নির্মাণের কাজের মান যাচাই, প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ও বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক পর্যালোচনা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল-ভাউচার পরীক্ষা এবং নাগরিক সেবায় বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গাংনী পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী শামীম রেজার বক্তব্য চেয়ে একাধিক বার কল করা হলেও ফোন কল গ্রহণ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলে কোন জবাব মেলেনি। পরবর্তীতে বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
