রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় যেন আইনের চোখে ধুলো দিয়ে গড়ে উঠেছে এক ‘বিতর্কিত বহুতল’। অভিযোগ উঠেছে—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর অনুমোদিত নকশা বিকৃত করে, পাশের মালিকের জমি দখল করে এবং একের পর এক নোটিশ অমান্য করে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
মধ্য বাড্ডার ট-৬৬/২ নম্বর বাড়িতে গত বছরের শেষ দিকে মো. শামিম আহম্মেদ, মো. সেলিম আহম্মেদ ও সোহেল নামের তিন ব্যক্তি রাজউকের অনুমোদন নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু পরিদর্শনে গিয়ে রাজউক দেখতে পায়—নকশা ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে রয়েছে বিস্তর গরমিল। নির্মাণসামগ্রী, কাঠামো ও পরিকল্পনায় ছিল গুরুতর অসঙ্গতি। ফলে সাময়িকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
নকশা এক, দখল আরেক- রাজউক ০৭৩২ অযুতাংশ জমির ওপর নকশার ছাড়পত্র দিলেও অভিযোগ রয়েছে, ভবন মালিকরা ০৮৩২ অযুতাংশ জমি ‘অধিগ্রহণ’ করে নির্মাণ চালান। পাশের বাড়ির মালিক জাহিদুর রহমান খান জমি দখলের অভিযোগে রাজউকে লিখিত আবেদন করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে রাজউক নোটিশ জারি করে এবং বাড্ডা থানাকে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধে অবহিত করে।
কিন্তু অভিযোগ—আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোপনে চলতে থাকে নির্মাণকাজ। একাধিক নোটিশ সত্ত্বেও থামেনি কাজ। স্থানীয়রা বলছেন, “দায়সারা নোটিশ দিয়ে রাজউক দায় ঝেড়েছে, আর ভবন মালিকরা হয়েছেন আরও বেপরোয়া।
৪০% খোলা জায়গা নেই, পার্কিং দখল করে বাণিজ্য!
বহুতল ভবনে নকশা অনুযায়ী ৪০ শতাংশ খোলা জায়গা রাখার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ। নির্মাণসাইটে অনুমোদনপত্র সংরক্ষণ বা প্রদর্শনের নিয়ম থাকলেও পরিদর্শনে তা দেখাতে পারেননি মালিকপক্ষ। এমনকি কোনো তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ডও ছিল না।
অভিযোগ আরও রয়েছে— লিফটের নির্ধারিত স্পেস না রেখে সরু সিঁড়ি নির্মাণ। গ্রাউন্ড ফ্লোরের পার্কিং স্পেসকে কমার্শিয়াল জোনে রূপান্তর, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা, রাজধানীতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি যখন আলোচনায়, তখন এ ধরনের নির্মাণকে “সময়বোমা” বলছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
হাইকোর্টে রিট, স্থগিতাদেশে ‘দৌড়’ শেষ!
চূড়ান্ত নোটিশ পাওয়ার পর ভবন মালিকরা হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। প্রাথমিকভাবে চার সপ্তাহের জন্য কার্যক্রম স্থগিত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় আদালত। পরে ছয় মাসের সময় বাড়ানো হলে দ্রুতগতিতে নির্মাণ শেষ করা হয়। রিটের কার্যক্রম বন্ধ হলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি রাজউক—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ঘুষের গুঞ্জন, সাবেক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা?
অভিযোগ উঠেছে, রাজউকের এক সাবেক অথরাইজড অফিসার প্রবাসী মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে রিট করানোর পরামর্শ দেন। বর্তমান অথরাইজড অফিসার ইমরুল কায়সারের বিরুদ্ধেও রিটে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জোন-৪/১-এর সাবেক পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেছেন, “অনিয়মের জন্য অ্যাকশন নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত নোটিশ জারি করা হয়েছে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাইফুল ইসলাম এর পোস্টিং হওয়ায় থেমে গেছে সকল কার্যক্রম।
দুদকে অভিযোগের হুমকি : ভুক্তভোগীদের দাবি—রাজউক চেয়ারম্যান দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ অভিযোগ করবেন।
মধ্য বাড্ডার এই বহুতল ভবন এখন কেবল একটি ভবন নয়—এটি হয়ে উঠেছে নগর পরিকল্পনা, আইনের শাসন ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার বড় প্রশ্নচিহ্ন। রাজধানীর বুকে আর কত ‘নকশা-খেকো’ ভবন দাঁড়াবে, তার জবাব চায় দেশবাসী।
পরবর্তী সংখ্যায় যা থাকছে – জোন-৬/১ নোটিশ গায়েবের পরে চলছে মিটার বানিজ্য।এর সঙ্গে জড়িত অথরাইজড অফিসার এবং দুই পরিদর্শকের ভূমিকা। মিটার প্রতি কত টাকা লেনদেন হয়েছে বিস্তারিত প্রকাশ পাবে চোখ রাখুন।
