রাজধানীর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর জোন–২-এর পরিচালক মোবারক হোসেন-কে ঘিরে নতুন করে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—রাজউকে কাজ করাতে হলে ঘুষ ছাড়া উপায় নেই—এই পুরোনো অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উঠে এসেছে এই কর্মকর্তার নাম।
বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, একজন সরকারি চাকরিজীবী হয়েও মোবারক হোসেন ও তাঁর পরিবারের নামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব সম্পদের বড় একটি অংশ নাকি অর্জিত হয়েছে অবৈধ উপায়ে। যদিও অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়নি।
রাজউকে সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের ক্ষোভ- দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিকদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন, প্লট সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই কিংবা অন্যান্য সেবা পেতে গেলে রাজউকে নানা জটিলতা ও ধীরগতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেকের দাবি, এসব জটিলতার আড়ালে রয়েছে ঘুষের অদৃশ্য শৃঙ্খল।
অভিযোগকারীরা বলছেন, জোন–২-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মোবারক হোসেনের নির্দেশ ছাড়া অনেক কাজ এগোয় না। আর কাজ দ্রুত করতে চাইলে নাকি নির্দিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের চাপ তৈরি করা হয়।
উত্তরায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের অভিযোগ- অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা এলাকায় গত কয়েক বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন মোবারক হোসেন। অভিযোগকারীদের দাবি, উত্তরা সেক্টর–১৩-এ তাঁর নামে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যার প্রতিটির বাজারমূল্য ১৮ কোটি টাকারও বেশি।
শুধু তাই নয়, একই এলাকায় আরেকটি ফ্ল্যাট তাঁর ব্যবহারাধীন রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব ফ্ল্যাট আধুনিক নকশা ও ব্যয়বহুল নির্মাণসামগ্রী দিয়ে নির্মিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এই সম্পদ কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
কোটি টাকার প্লট কেনার অভিযোগ- মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে উত্তরা সেক্টর–১৫ এলাকাতেও জমি কেনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা জানান, সেক্টরের ৩ নম্বর রোডে তিন কাঠার একটি প্লট প্রায় তিন কোটি টাকায় কেনা হয়েছে। একই এলাকায় মেইন রোডসংলগ্ন আরেকটি প্লট নাকি কেনা হয়েছে প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ টাকায়। এই প্লটগুলো কেনার জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও দাবি করছেন অভিযোগকারীরা।
রাজধানীর বাইরে জমির অভিযোগ- রাজধানীর বাইরে পাবনার হাটগ্রাম মৌজাতেও তাঁর নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে সেখানে একাধিক খণ্ড জমি কেনা হয়েছে, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকার মধ্যে। অভিযোগকারীরা মনে করেন, এসব সম্পদের বেশিরভাগই সরকারি পদ ব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে।
বিলাসবহুল গাড়ির কথাও শোনা যাচ্ছে- মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর নামে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি থাকার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িগুলোর মূল্য কয়েক কোটি টাকার সমান। সাধারণত এমন গাড়ি উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী বা বড় উদ্যোক্তাদের মধ্যেই বেশি দেখা যায় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের অনুসন্ধান থেমে যাওয়ার অভিযোগ- ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল বলে জানা যায়। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু তথ্য সংগ্রহের পর রহস্যজনকভাবে সেই অনুসন্ধানের অগ্রগতি থেমে যায়। তাদের মতে, কোনো প্রভাবশালী মহলের কারণে তদন্তটি স্থগিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজউকের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন- মোবারক হোসেনকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের পর রাজউকের কার্যক্রম ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
রাজউকের অভ্যন্তরে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও ‘চলতি টাকা’র সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সেই পুরোনো সমস্যারই প্রতিফলন হতে পারে।
এখনো প্রমাণ হয়নি অভিযোগ- তবে এ পর্যন্ত মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। তিনিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি চাইলে তাঁর সম্পদ বিবরণী, কর রিটার্ন ও ব্যাংক লেনদেনের নথি প্রকাশ করে অভিযোগগুলোর জবাব দিতে পারেন। তাতে জনমনে সৃষ্টি হওয়া সন্দেহ অনেকটাই দূর হতে পারে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি- নাগরিক সমাজ ও স্বচ্ছতা–পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দ্রুত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্ত হলে হয় অভিযোগ প্রমাণিত হবে,নয়তো পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ যেমন প্রমাণিত নয়, তেমনি পুরোপুরি অস্বীকারও করা যাচ্ছে না। ফলে রাজউকের এই কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক ও আলোচনাও থামছে না।
পরবর্তী সংখ্যায় দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে বিতর্কের কারণ। মোবারকের নিরবতা প্রশ্ন-বিদ্ধ। চলমান আছে
