রাজধানীর বাংলামটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘রক্তে ভেজা স্বাধীনতা থেকে সংস্কার ও গণভোট: বাস্তবায়নের রাজনৈতিক কর্তব্য’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভায় কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে—২০২৯ সাল পর্যন্ত—ক্ষমতায় রাখার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল বা “স্ট্র্যাটেজি” সাজানো ছিল বলে বিস্ফোরক দাবি করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ‘রক্তে ভেজা স্বাধীনতা থেকে সংস্কার ও গণভোট: বাস্তবায়নের রাজনৈতিক কর্তব্য’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা জানান। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই প্রভাবশালী কিছু প্রতিষ্ঠান—যাদের তিনি ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে উল্লেখ করেন—তাদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব আসে। সেখানে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত—আপনারাই সেটি পূর্ণ করুন, আমরা সহযোগিতা করব। তবে তিনি দাবি করেন, এ প্রস্তাবের সঙ্গে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার একটি রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়। তার ভাষায়, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাজা বহাল রেখে কিংবা দীর্ঘায়িত করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ ঠেকানোর পরিকল্পনাও ছিল সেই কৌশলের অংশ।
তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন না—এই হিসাব করেই পুরো পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল, বলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত এমন প্রস্তাবে তারা সায় দেননি বলেও স্পষ্ট করেন আসিফ।
এ সময় তিনি জ্বালানি খাত নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, বড় বড় কোম্পানি তেল মজুত করছে এবং এই মজুত সিন্ডিকেটের সঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন অংশের যোগসাজশ রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি হিসাবে দুই মাসের তেল মজুত থাকার কথা। অথচ এক মাসের মধ্যেই সংকট তৈরি হচ্ছে—এটা স্বাভাবিক নয়। নিশ্চয়ই সরকারের ভেতরের কেউ বা ঘনিষ্ঠ মহল এতে জড়িত।
বিএনপির বিরুদ্ধে প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগও তোলেন তিনি। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে দলটি গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মন্তব্য করেন আসিফ।
যাদের ভবিষ্যতে মেয়র পদে নির্বাচন করানো হবে, তাদেরই যদি আগে প্রশাসক বানানো হয়—তাহলে নির্বাচনের সমতা কোথায়?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে আসিফ বলেন, তারা সবসময় গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন, যাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সেই নৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে পারেনি। তার দাবি, আগের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিকে বর্তমান সরকার মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে—যা “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড”-এর যুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অনুষ্ঠানে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চা দীর্ঘদিন ধরে সংকীর্ণ বিতর্কে আটকে আছে। কে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন—এই প্রশ্নেই আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, প্রকৃত ইতিহাস হলো জনগণের সংগ্রাম, ত্যাগ ও অবদানের ইতিহাস। কিন্তু সরকার বদলালেই ইতিহাসের বয়ান বদলে যায়—এটি দুঃখজনক বাস্তবতা।
সারোয়ার তুষার আশা প্রকাশ করেন, সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রবণতা বদলাবে। তবে এখনো রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও যোগ করেন, ১৯৯০-এর পর যেসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা ছিল, সেগুলোর অনেকই আজও বাস্তব রূপ পায়নি—এবং সেই একই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।
