গত শনিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে। ছবি-ভিডিও থেকে নেওয়া
ঈদের ছুটি শেষে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরেছিলেন দুই বোন। ভোররাতের নির্জন রাজধানীতে হয়তো দ্রুত বাসায় পৌঁছানোর তাড়াই ছিল তাদের একমাত্র চিন্তা। কিন্তু বাসার গেটের সামনে অপেক্ষা করছিল এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। মাত্র ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে ধারালো চাপাতির মুখে তাদের নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোন, লাগেজ—এমনকি ঈদের কোরবানির মাংসও লুট করে নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র।
ভুক্তভোগীদের একজন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং অন্যজন মোহাম্মদপুরের একটি কলেজের এমবিএ শিক্ষার্থী। ঈদুল আজহার ছুটি কাটিয়ে ঠাকুরগাঁও থেকে বাসে করে শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে তারা ঢাকার শ্যামলীতে পৌঁছান। সেখান থেকে রিকশায় করে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের এম গলির বাসার উদ্দেশে রওনা দেন।
সন্দেহজনক পিকআপের রহস্যময় অনুসরণ
ভুক্তভোগীর বর্ণনায় উঠে এসেছে, এম গলিতে ঢোকার পর একটি পিকআপ ভ্যান তাদের রিকশার পাশে এসে থামে। ভেতর থেকে একজন ৬ নম্বর সড়কের খোঁজ জানতে চায়। রিকশাচালক দিকনির্দেশনা দিলে পিকআপটি সামনে চলে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেটি আবার ফিরে আসে।
ঠিক তখনই দুই বোন বাসার সামনে পৌঁছে রিকশা থেকে নামছিলেন। আর সেই মুহূর্তেই পিকআপটি তাদের পাশে এসে থামে। গাড়িতে চালকসহ তিনজন ছিল।
চাপাতি হাতে নেমে আসে আতঙ্ক
পিকআপ থামতেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হয় দুই বোনের। তারা নিরাপত্তাকর্মীকে ডাকতে শুরু করেন। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।
এরই মধ্যে লুঙ্গি ও ক্যাপ পরা এক ব্যক্তি হাতে চাপাতি নিয়ে পিকআপ থেকে নেমে আসে। শুরু হয় ভয়াবহ হুমকি।
— যা আছে সব বের কর। ফোন কোথায়? মানিব্যাগ কোথায়?
একপর্যায়ে আরও একজন দুর্বৃত্ত গাড়ি থেকে নেমে আসে এবং দুই বোনকে তল্লাশি শুরু করে। গলায় চেইন, কানে দুল বা অন্য কোনো স্বর্ণালঙ্কার আছে কি না তাও খুঁজে দেখে তারা।
‘টু শব্দ করলে গলা দুই টুকরা করে দেব’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা বারবার প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছিল।
“একটা শব্দ করবি না। টু শব্দ করলে এক কোপে কল্লা ফেলে দেব। গলা দুই টুকরা করে দেব।”
রিকশাচালক প্রথমে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে তাকেও ধাক্কা দিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
টাকা-স্বর্ণ নয়, নিয়ে গেল ঈদের মাংসও
প্রথমে দুই বোন ভেবেছিলেন ছিনতাইকারীরা হয়তো মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা নিয়েই চলে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে আরও ভয়াবহ ঘটনা।
দুর্বৃত্তরা তাদের সব লাগেজ, ভ্যানিটি ব্যাগ এবং গ্রামের বাড়ি থেকে আনা জিনিসপত্র পিকআপে তুলে নেয়। লুট হওয়া মালামালের মধ্যে ছিল—
প্রায় ১০ কেজি কাঁচা কোরবানির মাংস
প্রায় দেড় কেজি রান্না করা মাংস
আটা ও আম
নগদ ৩৪ হাজার টাকা
দুই বোনের স্বর্ণের চেইন, কানের দুল, ব্রেসলেট ও আংটি
মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রী
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, রান্না করা মাংসটি তাদের মা নিজ হাতে রান্না করে দিয়েছিলেন। সেটিও নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
একটিমাত্র ভুলে বাঁচল একটি ফোন
ভুক্তভোগী জানান, তার বড় বোন শ্যামলীতে রিকশায় ওঠার সময় মোবাইল ফোন ও একটি ছোট ব্যাগ রিকশার সিটের নিচে রেখে দিয়েছিলেন। সম্ভবত ছিনতাইকারীদের চোখ এড়িয়ে যাওয়ায় সেটি উদ্ধার হয়।
মাত্র ৮৭ সেকেন্ডে শেষ অপারেশন
পুরো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে মাত্র ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে। পরিকল্পিতভাবে এসে, ভয় দেখিয়ে, সব মালামাল পিকআপে তুলে নিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে দুর্বৃত্তরা।
তারা চলে যাওয়ার পর দুই বোন নিরাপত্তাকর্মীকে ডেকে বাসায় ওঠেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। রোববার থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
প্রশ্নের মুখে নগর নিরাপত্তা
ঘটনাটি শুধু একটি ছিনতাই নয়, বরং রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ভোররাতে জনশূন্য এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান এসে প্রায় দেড় মিনিট ধরে দুই নারীকে জিম্মি করে সবকিছু লুট করে নিয়ে গেল, অথচ আশপাশে কেউ এগিয়ে এল না, নিরাপত্তাকর্মীরও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
ঈদ শেষে স্বজনদের দেওয়া ভালোবাসা, মায়ের হাতে রান্না করা খাবার আর কষ্টার্জিত সঞ্চয় নিয়ে যারা ঢাকায় ফিরেছিলেন, তাদের জন্য সেই রাতটি পরিণত হয়েছে এক বিভীষিকাময় স্মৃতিতে। এখনো আতঙ্ক কাটেনি দুই বোনের; তাদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—রাজধানীর বাসার গেটের সামনেও যদি নিরাপত্তা না থাকে, তবে মানুষ নিরাপদ কোথায়?
