সকাল সোয়া ৬টায় সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ
ভোর তখন ঠিক পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আলোর নরম পরশে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে রাজধানীর আকাশ। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়তেই যেন রমনার বটমূল ডেকে ওঠে—এসো, নতুনকে বরণ করি। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে লাল-সাদা শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সেজে মানুষের ঢল নামে। মনে হয়, এ শুধু উৎসব নয়—এ যেন হৃদয়ের এক গভীর মিলনমেলা।
এই মিলনের কেন্দ্রে চিরচেনা এক নাম—ছায়ানট। ১৯৬৭ সাল থেকে যারা বাঙালির নববর্ষের ভোরকে সুরে-ছন্দে রাঙিয়ে আসছে, তারা এবারও স্বাগত জানায় বাংলা ১৪৩৩-কে। এবারের প্রতিপাদ্য—“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সেই অমর চেতনা, যা মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়, সাহসের আলো জ্বালে।
সকাল সোয়া ছয়টায় যখন সম্মেলক কণ্ঠে ভেসে ওঠে “জাগো আলোক-লগনে”, তখন মনে হয়—রাতের সমস্ত অন্ধকার ভেঙে এক নতুন দিনের দরজা খুলে যাচ্ছে। গানের সুরে সুরে যেন জেগে ওঠে আশা, ছড়িয়ে পড়ে আলো। এরপর একে একে মঞ্চে ধরা দেয় কাজী নজরুল ইসলাম-এর দ্রোহ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-এর দেশপ্রেম, আর লালন সাঁই-এর মানবতার গভীর সুর।
গান যেন শুধু গান থাকে না—এগুলো হয়ে ওঠে অনুভবের নদী। “ভয় হতে তব অভয় মাঝে”, “পথে এবার নামো সাথী”, “এসো মুক্ত করো”—এসব গানে গানে ভেসে আসে মুক্তির ডাক, ভালোবাসার আহ্বান। আবৃত্তির শব্দেও মিশে যায় সেই সুর, যেখানে কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন হৃদয়ে নরমভাবে ছুঁয়ে যায়।
প্রায় দুই শতাধিক শিল্পীর কণ্ঠে, শিশুর নিষ্পাপ হাসি থেকে প্রবীণের অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে—সবাই মিলে তৈরি হয় এক অনন্য সেতুবন্ধন। প্রজন্মের ভিন্নতা ভুলে গিয়ে সবাই যেন এক সুরে বাঁধা পড়ে—সংস্কৃতির সুরে, ভালোবাসার সুরে।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে যখন জাতীয় সংগীত ধ্বনিত হয়, তখন চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধ আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আসল কথা উচ্চারিত হয় শেষে—যখন কথা বলেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী।
তার কণ্ঠে উঠে আসে সময়ের অস্থিরতার গল্প, সহিংসতার ছায়া, আর সংস্কৃতির ওপর নেমে আসা অদৃশ্য চাপ। তবুও সেই কণ্ঠে হতাশা নয়—বরং ছিল এক গভীর প্রত্যাশা। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলবে, গান গাইবে, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসবে।
রমনার বটমূল তখন শুধু একটি স্থান নয়—এ যেন হয়ে ওঠে এক প্রতীক। ভালোবাসার, সাহসের, আর অদম্য সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক।
যেখানে এখনও ভেসে আসে সেই চিরন্তন প্রার্থনা—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির…”।
