রাজধানীর খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক যেন নতুন করে আগুন ছড়াতে শুরু করেছে। প্রভাব, ঘুষ, গোপন সমঝোতা ও রাজনৈতিক ছায়ার অভিযোগের কেন্দ্রে আবারও উঠে এসেছে খিলগাঁওয়ের সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহর নাম।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, যে দলিল একসময় “আইনি জটিলতা” দেখিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, সেটিই পরে রহস্যজনকভাবে গোপনে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে। আর এই ঘটনাকে ঘিরেই এখন প্রশাসনিক অঙ্গনে বইছে চাপা ক্ষোভ ও তীব্র আলোচনা।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের সাবেক ৭৪ নং ওয়ার্ড কমিশনার কালাম ও আজিজুল গং একটি বিতর্কিত জমির দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান।
সে সময় কাগজপত্রে জটিলতার কথা বলে রেজিস্ট্রেশন করতে অস্বীকৃতি জানান সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল। এমনকি আইজিআর-এর সুপারিশ থাকার পরও দলিলটি নিবন্ধন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তখন মাইকেল দাবি করেছিলেন—“আইন উপদেষ্টার নিষেধ আছে, এই দলিল রেজিস্ট্রি সম্ভব নয়।” কিন্তু কয়েক সপ্তাহ না যেতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। অভিযোগ উঠেছে, পরবর্তীতে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গোপনে সম্পন্ন করা হয় সেই বহুল আলোচিত দলিল রেজিস্ট্রেশন।
এ ঘটনায় এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে—
যে দলিল একসময় আইনগতভাবে “অগ্রহণযোগ্য” ছিল, সেটি হঠাৎ করে কীভাবে বৈধতা পেল? আইনের অবস্থান বদলেছে, নাকি বদলে গেছে টাকার অংক?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট, যেখানে দালাল, প্রভাবশালী মহল ও অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চলে “বিশেষ সুবিধা”র বাণিজ্য। সাধারণ মানুষ মাসের পর মাস ঘুরেও যেখানে কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না, সেখানে প্রভাবশালীদের জন্য খুলে যায় গোপন দরজা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কিছু কর্মকর্তা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানও বদলে নিতে অভ্যস্ত। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ ও বলয় অটুট থেকে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক-এর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে পূর্ববর্তী সরকার আমলে বিভিন্ন রেজিস্ট্রি অফিসে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন মাইকেল মহিউদ্দিন।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ, দলিল মূল্যায়নে অনিয়ম এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে দলিলের শ্রেণি পরিবর্তন ও সম্পত্তির মূল্য কম দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ঘিরেও তার অঘোষিত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ফাইল নিষ্পত্তি পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে গোপন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—
দুদক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চোখের সামনেই যদি বছরের পর বছর এমন অভিযোগ ঘুরেফিরে সামনে আসে, তাহলে তদন্ত কোথায় আটকে আছে? প্রশাসনিক নীরবতা
প্রশাসনিক নীরবতার আড়ালে কি আরও বড় কোনো শক্তি কাজ করছে?
এদিকে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট দলিল পুনঃযাচাই, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা।
তাদের ভাষ্য—
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত যদি ঘুষ, প্রভাব আর গোপন সমঝোতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়বে।
এসব বিষয় বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে, মাইকেল মহিউদ্দিন বলেন, আপনি অফিসে আসেন আপনাকে চায়ের দাওয়াত। তবে আমি মোবাইলে বক্তব্য দেইনা।
এসব অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পরবর্তী সংখ্যায় থাকছে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের এপিএস রাশেদুল কাওসার ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন মাইকেল মহিউদ্দিন। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকায় তার সকল অবৈধ সম্পদের দেখভাল করছেন খিলগাঁও সার রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন। এবং সোয়াদ বিল্ডার্সের ৪৮ টি ফ্ল্যাট ৬০ লাখ টাকা হিসেবে বহায় মূল্য নির্ধারণ করলেও ঘূষের বিনিময় ২৭ লাখ টাকা মূল্যে দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রারী করেছেন। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়।
