রবিবার, ৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা থেকে বিএনপিপন্থী পরিচয়!ক্ষমতার পালাবদলে বদলে গেলেন বিআইডব্লিউটিএর আরিফ উদ্দিন—‘ট্রামকার্ডে’ তটস্থ প্রতিষ্ঠান,শাস্তির বদলে পদোন্নতি

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে গেছে পরিচয়ও! একসময় আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, বঙ্গবন্ধু পরিষদের মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সক্রিয় থাকা বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন এখন নিজেকে ‘বিএনপিপন্থী’ ও ‘একদা ছাত্রদলকর্মী’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আরিফ উদ্দিনের কথিত ‘ট্রামকার্ড’ ও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে বিআইডব্লিউটিএর ভেতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের তটস্থ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গুরুতর অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরও কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে সেই আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে দেওয়া হলো—এ নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, কোনো শাস্তি ভোগ না করে উল্টো পদোন্নতি পাওয়ার ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন এবং অতীত ভূমিকার বিষয়েও তদন্ত প্রয়োজন।

বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ‘লড়াকু সৈনিক’ হিসেবে প্রশংসা

২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, সোমবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে ‘রুখে দাও লেলিহান’ ও ‘জাতীয় সংসদে শাহজাহান খান এমপি’ শীর্ষক দুটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মোড়ক উন্মোচন করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এমপি।

অনুষ্ঠানে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান এমপি বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক—বর্তমানে পরিচালক—এ কে এম আরিফ উদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

শাহজাহান খান তার বক্তব্যে জানান, ‘রুখে দাও লেলিহান’ বইটির প্রচ্ছদ ও নামকরণ করেছিলেন এ কে এম আরিফ উদ্দিন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই অনুষ্ঠানে শাহজাহান খান আরিফ উদ্দিনকে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের পক্ষের লড়াকু সৈনিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক সাংবাদিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

প্রকাশনার নেপথ্যেও আরিফ?

সূত্রের দাবি, বইটির প্রকাশক হিসেবে শাহজাহান খানের স্ত্রী সৈয়দ রোকেয়া বেগম এবং প্রকাশনী সংস্থা হিসেবে সার্বিক সাহিত্য প্রকাশনীর নাম উল্লেখ থাকলেও বইটি রাজধানীর ফকিরাপুলের পানগুছি প্রিন্টার্স থেকে আরিফ উদ্দিনের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে ছাপানো হয়েছিল।

বইটির রচনা ও প্রকাশনায় সহযোগিতার মাধ্যমে আরিফ উদ্দিন তৎকালীন মন্ত্রী শাহজাহান খানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে বিআইডব্লিউটিএতে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বিস্তৃত হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।

যে বইয়ে বিএনপি জোটকে ‘অগ্নি সন্ত্রাসী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার ‘রুখে দাও লেলিহান’ গ্রন্থে ২০১৩ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি জোটের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়।

বিএনপি জোটের আন্দোলনকে ‘অগ্নি সন্ত্রাস’ হিসেবে তুলে ধরে গ্রন্থটিতে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা করা হয়েছিল বলে সূত্রের দাবি।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

যে আরিফ উদ্দিনের নাম ওই গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও নামকরণের সঙ্গে জড়িত, যিনি বইটির প্রকাশনায় সহযোগিতা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, সেই একই ব্যক্তি এখন কীভাবে ‘নিবেদিতপ্রাণ বিএনপি’ কিংবা ‘সাবেক ছাত্রদলকর্মী’ পরিচয় সামনে আনছেন?

৫ আগস্টের পর ‘পরিচয় বদলের’ অভিযোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ কে এম আরিফ উদ্দিনের রাজনৈতিক পরিচয়ে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে—এমন অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখন তিনি নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এমনকি একসময় ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন—এমন প্রচারণাও চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।

তবে বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে সামনে এনে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আরিফ উদ্দিনকে বিআইডব্লিউটিএ বঙ্গবন্ধু পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচি, মিছিল-মিটিং ও আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে দেখা গেছে।

শোক দিবসে কালোব্যাজ ধারণ করে র‌্যালিতে অংশ নেওয়া, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনুদান দেওয়া এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রশংসাসূচক পোস্ট দেওয়ার তথ্য-প্রমাণও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

দুই মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা—সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান এবং প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে আরিফ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দুই মন্ত্রীর আশীর্বাদে তিনি বিআইডব্লিউটিএতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

এমনকি ওই দুই মন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরিফ উদ্দিনের আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

নারীঘটিত অভিযোগে বরখাস্ত, পরে রহস্যজনক পুনর্বহাল?

এদিকে সম্প্রতি এ কে এম আরিফ উদ্দিনের কথিত পরকীয়া সম্পর্ক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রী-সন্তান বিদেশে থাকার সুযোগে তিনি দেশে অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে জনতার হাতে ধরা পড়েন।

এ ছাড়া সাধারণ নারীদের প্রলোভনে ফেলে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং পরবর্তীতে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নৈতিক স্খলন ও অসদাচরণের অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—যে অভিযোগে একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল, সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না করেই কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হলো?

আরও বিস্ময়ের বিষয়, তাকে বিআইডব্লিউটিএর গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক (ক্রয় ও সংরক্ষণ) পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

‘অদৃশ্য শক্তি’ কার?

একদিকে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠতার ছবি-ভিডিও ও কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, অন্যদিকে ৫ আগস্টের পর বিএনপিপন্থী পরিচয়ের দাবি; এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নারীঘটিত অভিযোগে বরখাস্ত এবং পরবর্তীতে পুনর্বহালের ঘটনা।

সব মিলিয়ে আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে প্রশ্ন এখন একটাই—

কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে বারবার রক্ষা পাচ্ছেন তিনি?

বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ও সমালোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ নয়; আরিফ উদ্দিনের আওয়ামী লীগ আমলের ভূমিকা, কথিত রাজনৈতিক যোগাযোগ, সম্পদ অর্জন, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার,অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং সাময়িক বরখাস্তের পর পুনর্বহালের পুরো প্রক্রিয়া—সবকিছু একসঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই পারে—‘আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা থেকে বিএনপিপন্থী’ এই নাটকীয় পরিচয় বদলের নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, আর কারা কলকাঠি নেড়েছেন—সেই রহস্যের জট খুলতে।

আলোকচিত্রে (ক্লকওয়াইজ): আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এ কে এম আরিফ উদ্দিন; সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আরিফ; বঙ্গবন্ধু পরিষদের মিছিলে আরিফ উদ্দিন এবং আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি।

এসব সঠিক প্রমাণ থাকলেও নেই কোনো জবাবদিহি। তবে আদৌ কী বিচারের মুখোমুখি করা হবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নেটিজেনরা। চলবে…….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।