পুড়ে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, ছাইয়ের নিচে চাপা পড়েছে এক পরিবারের ভবিষ্যৎ। ফাইল ছবি
কিছু আগুন শুধু সম্পদ পুড়িয়ে দেয় না, পুড়িয়ে দেয় মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের সমস্ত পরিকল্পনা। কিছু ধ্বংসস্তূপের ভেতর শুধু পোড়া ইট-কাঠ কিংবা কাগজের গন্ধ থাকে না, থাকে অসংখ্য নির্ঘুম রাতের পরিশ্রম, পরিবারের হাসি-কান্না আর একজন উদ্যোক্তার জীবনভর লালিত স্বপ্নের ছাই।
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ উপজেলার তেঘরিয়া ইউনিয়নের বনগ্রাম এলাকায় অবস্থিত ‘রোবেল এন্ড সন্স’ নামের একটি পুরাতন কাগজের দোকানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে তেমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মুহূর্তের আগুনে পুড়ে গেছে বিপুল পরিমাণ পুরাতন কাগজ, ব্যবসায়িক মালামাল, যন্ত্রপাতি ও মূল্যবান সম্পদ। প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ জুন দুপুর আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটে কর্মচারীরা খাবারের বিরতিতে গেলে হঠাৎ দোকানের ভেতর আগুনের সূত্রপাত ঘটে। প্রথমে ছোট্ট একটি ধোঁয়ার কুণ্ডলী, তারপর মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। কাগজের বিশাল মজুদ থাকায় অগ্নিশিখা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আগুন গ্রাস করে নিয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ সম্পদ।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, থানা প্রশাসনের সদস্যরা এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরা।
ধোঁয়া উঠছিল একদিন পরও
এই প্রতিনিধির সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডের একদিন পরও পোড়া কাগজের স্তূপের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কালো ছাই, পোড়া টিন, ভস্মীভূত কাগজ আর ধ্বংসাবশেষ।
দেখে মনে হচ্ছিল—কিছুক্ষণ আগেও এখানে ছিল একটি সচল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যেখানে কর্মচারীদের ব্যস্ততা ছিল, মালামালের আনাগোনা ছিল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার হিসাব ছিল। এখন সেখানে শুধু নিস্তব্ধতা, পোড়া গন্ধ আর দীর্ঘশ্বাস।
ঘটনাস্থলে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও শুভানুধ্যায়ীরা। অনেকের চোখেই ছিল বিস্ময়, আবার অনেকের কণ্ঠে ছিল সমবেদনার ভারী সুর।
সাধারণ ডায়েরি, তদন্তের দাবি
ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মোঃ রোবেল মিয়া ২৪ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

তিনি অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তার দাবি, প্রকৃত কারণ উদঘাটন না হলে এই অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে নানা প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যাবে।
সংগ্রামের ঘামে গড়া এক স্বপ্নের নাম ‘রোবেল এন্ড সন্স’
জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার হিরণ্যবাড়ি গ্রামের প্রয়াত জোয়াদ আলীর সন্তান মোঃ রোবেল মিয়া।
স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে বহু বছর আগে তিনি ঢাকায় আসেন। শুরুটা ছিল সীমিত পুঁজি দিয়ে, কিন্তু ছিল অসীম সাহস ও কঠোর পরিশ্রম।
দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শ্রম, সততা এবং ব্যবসায়িক নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে গড়ে তোলেন পুরাতন কাগজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘রোবেল এন্ড সন্স’।

বৈধ কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের মাধ্যমে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর আস্থার জায়গা হয়ে ওঠে। বহু মানুষের কর্মসংস্থানেরও উৎস ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, রোবেল মিয়ার এই ব্যবসা শুধু ব্যবসা নয়, এটি তার জীবনের গল্প। নিজের ঘাম, শ্রম আর ত্যাগ দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করিয়েছেন।
তাই এই অগ্নিকাণ্ড তার কাছে কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়; এটি বহু বছরের সংগ্রাম ও স্বপ্নের ওপর নেমে আসা এক নির্মম আঘাত।
দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কোনো কারণ?
অগ্নিকাণ্ডের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগুনের প্রকৃত উৎস কোথায়?
এটি কি বৈদ্যুতিক ত্রুটিজনিত দুর্ঘটনা? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ?
যদিও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন না হলে শুধু এই ঘটনারই নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকিরও সমাধান হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরাতন কাগজের গুদাম ও দোকান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অসাবধানতা কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ডেকে আনতে পারে। তাই তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড, চুরি, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় প্রায়ই তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।

একজন উদ্যোক্তা বছরের পর বছর ধরে শ্রম, ত্যাগ, মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অথচ একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তাকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বীমা সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা
স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজের প্রত্যাশা, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করবে।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।
ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে আছে এক পরিবারের ভবিষ্যৎ
আগুন কাগজ পুড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের সততা, সংগ্রাম, সাহস এবং স্বপ্নকে কখনো পুড়িয়ে দিতে পারে না।
আজ ‘রোবেল এন্ড সন্স’-এর পোড়া ভিটায় দাঁড়ালে দেখা যায় শুধু ছাই নয়; সেখানে চাপা পড়ে আছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, বহু বছরের কষ্টার্জিত অর্জন, অসংখ্য পরিকল্পনা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চাওয়া এক স্বপ্নের উত্তরাধিকার।
তবুও জীবন থেমে থাকে না
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানুষ নতুন করে বাঁচার শক্তি খুঁজে নেয়। ছাইয়ের ভেতর থেকেও কখনো কখনো জন্ম নেয় নতুন সূচনা।
এখন সবার একটাই প্রত্যাশা—ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হোক, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ন্যায়বিচার পান এবং একদিন আগুনের এই কালো ছাই ভেদ করে আবারও মাথা তুলে দাঁড়াক ‘রোবেল এন্ড সন্স’। কারণ স্বপ্নের মৃত্যু হয় না; স্বপ্ন শুধু অপেক্ষা করে আবার নতুন করে জেগে ওঠার।
