সোমবার, ৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কংসের ভয়াল ভাঙনে বিলীন জনপদ: বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার, স্থায়ী বাঁধের দাবিতে নদীপাড়ে আর্তনাদ

মামুনুর রশীদ মামুন
জুলাই ১৩, ২০২৬ ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ছবি : সমতল মাতৃভূমি

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কংস নদীর তীরজুড়ে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর অনিশ্চয়তার গল্প। প্রকৃতির নির্মম রূপ আর দীর্ঘদিনের নদীশাসনের ঘাটতিতে ধীরে ধীরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কাকৈরগড়া ইউনিয়নের ভাউরতলা, নগুয়া ও কুলঞ্জা গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। গত কয়েক দিনের ভয়াবহ নদীভাঙনে শত শত বসতঘর, আবাদি জমি, গাছপালা ও বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা স্বপ্নের ঠিকানা কংস নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

একসময় যেখানে ছিল শিশুদের কোলাহল, সবুজ ধানের ক্ষেত আর মানুষের জীবন-জীবিকা, সেখানে আজ শুধুই উত্তাল নদীর ঢেউ। নিজের চোখের সামনে বসতভিটা নদীতে তলিয়ে যেতে দেখে অসহায় মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর একটাই আকুতি—আমাদের বাঁচান, আমাদের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করুন।

নদীপাড়ে মানুষের কান্না, মানববন্ধনে ক্ষোভের বিস্ফোরণ

রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে কংস নদীর তীরে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে অংশ নেন ভাউরতলা, নগুয়া ও কুলঞ্জা গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু ও তরুণ। এটি শুধু একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি ছিল না; বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ আর্তনাদ।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মানুষের চোখেমুখে ছিল আতঙ্ক, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার ছাপ। কেউ হারিয়েছেন বসতঘর, কেউ কৃষিজমি, আবার কেউ জীবনের সমস্ত সঞ্চয়। অনেক পরিবার এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে।

বছরের পর বছর ভাঙন, তবু নেই কার্যকর প্রতিরোধ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কংস নদীর ভাঙন নতুন নয়। বছরের পর বছর বর্ষা এলেই নদী ভয়ংকর রূপ নেয়। প্রতিবারই ভাঙনের পর প্রশাসনের আশ্বাস মিললেও স্থায়ী কোনো নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষায়, প্রতিবারই কর্মকর্তারা আসেন, আশ্বাস দেন, ছবি তোলেন; কিন্তু বর্ষা শেষ হলে সব প্রতিশ্রুতিও হারিয়ে যায়। আমরা কি এ দেশের নাগরিক নই? কেন বারবার আমাদেরই ভিটেমাটি নদীতে হারিয়ে যাবে?

তাদের অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এত বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।

জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ কামনা

মানববন্ধনে এলাকাবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরলে দ্রুত স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

স্থানীয় বিএনপির নেতারাও মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, কংস নদীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি ভিত্তিতে নদীশাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এই জনপদ পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের তিন দফা দাবি

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবিগুলো স্পষ্ট—

১. জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা:

ভাঙনকবলিত স্থানগুলোতে দ্রুত জিও ব্যাগ, সিসি ব্লক ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

২. স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ:

প্রতি বছর একই দুর্ভোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ।

৩. ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন:

যেসব পরিবার ইতোমধ্যে সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের জন্য জরুরি ত্রাণ, নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এটি শুধু তিন গ্রামের সংকট নয়, একটি জাতীয় মানবিক ইস্যু

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন মহলের মতে, কংস নদীর ভাঙন এখন আর একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি একটি বৃহত্তর মানবিক ও পরিবেশগত সংকট। নদীভাঙনে প্রতি বছর অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হচ্ছে, কৃষিজমি হারিয়ে জীবিকা বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি প্রতিরক্ষা নয়, নদীর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ, বৈজ্ঞানিক নদীশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।

টনক নড়বে কি সংশ্লিষ্টদের?

আজ কংস নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু একটি প্রশ্নই করছে—আর কত ঘরবাড়ি, আর কত স্বপ্ন নদীগর্ভে হারালে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে?

ভাউরতলা, নগুয়া ও কুলঞ্জাসহ দুর্গাপুরের নদীপারের মানুষ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের বিশ্বাস, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা চিরতরে কংস নদীর স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়দের শেষ আবেদন—আমরা ভিক্ষা চাই না, চাই আমাদের ভিটেমাটি বাঁচুক। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করুন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।