শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খুলনায় চাঁদাবাজির বেপরোয়া তাণ্ডব: প্রকাশ্যে চাইনিজ কুড়াল নিয়ে পাঁচ যুবকের হামলা, মুহূর্তেই তছনছ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

খুলনা জেলা প্রতিনিধি
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ৪:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এক মাসে চার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের আতঙ্ক; পিটিআই মোড়কেন্দ্রিক সন্ত্রাসী তৎপরতায় উদ্বেগ, অভিযোগের তির নূর আজিজ বাহিনীর দিকে। ফাইল ছবি

শনিবার দুপুর পৌনে একটা। খুলনা নগরীর ব্যস্ততম পিটিআই মোড়। চারপাশে মানুষের চলাচল, আর পাশেই নিউ এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে রোগীদের ভিড়। ঠিক সেই মুহূর্তেই চাইনিজ কুড়াল হাতে পাঁচ যুবকের আকস্মিক অনুপ্রবেশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় তাণ্ডব। একের পর এক কোপে ভেঙে চুরমার করা হয় কাঁচের দরজা-জানালা, এসি, টেলিভিশন ও রিসিপশন কাউন্টার। মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় পুরো প্রতিষ্ঠান। আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের ছোটাছুটি। ভাঙচুর শেষে প্রকাশ্যেই নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হামলাকারীরা।

খুলনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী হামলার ধারাবাহিকতায় এটি গত এক মাসে চতুর্থ ঘটনা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ হিসাব করলে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দাঁড়িয়েছে পাঁচটিতে। প্রতিটি ঘটনায় একই ধরনের আতঙ্ক, একই কৌশলে হামলা এবং চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে এলেও দৃশ্যমান প্রতিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মালিকপক্ষের অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পিটিআই মোড়কেন্দ্রিক এসব হামলার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত নূর আজিজ ও তার বাহিনীর সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দাবি করা চাঁদা না দেওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও আইনগতভাবে প্রমাণ হওয়া এখনো বাকি। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় দুর্বৃত্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে পাঁচ যুবক খানজাহান আলী রোডের নিউ এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে প্রবেশ করেন। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল চাইনিজ কুড়াল। এরপর কোনো কথা না বলেই তারা প্রতিষ্ঠানের দুটি এসি, একটি টেলিভিশন, সামনের দরজার কাচ, রিসিপশন কাউন্টারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। হামলার একপর্যায়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক কর্মীর মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আকস্মিক এ হামলায় ভেতরে থাকা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভাঙচুর শেষে হামলাকারীরা নিজেরাই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে চলে যায়।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বেশ কিছুদিন আগে টুটপাড়ার নূর আজিম বাহিনীর এক সদস্য আমাকে ফোন দেয়। আমি বলি এই নামে কাউকে চিনি না। এ কথা বলার পরপরই বিপরীত দিক থেকে ফোন কেটে দেওয়া হয়। মালিকপক্ষের কারও কাছে চাঁদা চেয়েছে কিনা, আমার জানা নেই।

আগের ঘটনাগুলোর মতোই হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশের একটি দল। খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করা গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।

এক মাসে ধারাবাহিক হামলা, আতঙ্কে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান

খুলনা নগরীতে একের পর এক স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। গত মাসের মাঝামাঝি নগরীর রয়েল মোড়ে অবস্থিত সিটি কুইন্স ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর ২৪ অক্টোবর নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে ৮ থেকে ১০ জনের একটি মুখোশধারী দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।

হামলাকারীরা চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনের কাচ, চেয়ার ও টেবিল ভাঙচুর করে। তছনছ করা হয় ক্যাশ কাউন্টারও। যাওয়ার সময় আতঙ্ক ছড়াতে ক্লিনিকের বাইরে ফাঁকা গুলি ছোড়ে তারা। এতে রোগী, চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সন্ধানী ক্লিনিকের ঘটনার মাত্র চার দিন পর, ২৮ অক্টোবর নগরীর আহসান আহমেদ সড়কে অবস্থিত ‘চাইনিজ প্যালেস’ রেস্তোরাঁয় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েকজন যুবক রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে মালিককে খুঁজতে থাকে। তাকে না পেয়ে এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ তাদের কথিত ‘ভাইয়ের’ ফোন রিসিভ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর শামসুর রহমান রোডে অবস্থিত রংধনু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং আব্দুল্লাহ প্যাথলজিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। হামলাকারীদের হাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মারধরের শিকার হন।

মামলা না হওয়ায় পার পাচ্ছে হামলাকারীরা?

ধারাবাহিক এসব হামলার ঘটনায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী মামলা না করায় তদন্ত ও অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে কেন প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষ আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীদের নীরবতার পেছনে ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙচুরের ঘটনাগুলোতে ভুক্তভোগীরা কোনো মামলা করেননি। সন্ধানী ক্লিনিকের ঘটনায় গুলির খোসা পাওয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।’

এক মাসের ব্যবধানে নগরীর একাধিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, চাঁদা দাবির অভিযোগ এবং প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে রোগী ও চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।