বৃহস্পতিবার, ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে সেবা না হয়রানি? ডিডি বিপুল কুমার গোস্বামীকে ঘিরে দালাল সিন্ডিকেট, গ্রাহক ভোগান্তি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
জুলাই ২৩, ২০২৬ ১:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নতুন ডিডির যোগদানের পর বেড়েছে হয়রানি, দালাল ছাড়া মিলছে না সেবা—প্রতিদিন লাখ টাকার ‘অফিস খরচ’ আদায়ের অভিযোগে তোলপাড় পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিস। ফাইল ছবি

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে নতুন উপ-পরিচালক (ডিডি) বিপুল কুমার গোস্বামী যোগদানের পর থেকে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং তার অদৃশ্য প্রশ্রয়ে একটি সংঘবদ্ধ দালাল সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক, স্থানীয় সচেতন মহল এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। সরেজমিন অনুসন্ধানে গ্রাহক হয়রানি, আবেদন প্রক্রিয়ায় বৈষম্য, দালালদের অবাধ দৌরাত্ম্য এবং ঘুষ বাণিজ্যের নানা চিত্র উঠে এসেছে।

দায়িত্ব নেওয়ার সময় নিয়েই প্রশ্ন, সাংবাদিকদের নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য

সরেজমিন অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সকাল ১০টার দিকে উপ-পরিচালক (ডিডি) বিপুল কুমার গোস্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হলে তিনি শুরুতেই বলেন, জেলা পর্যায়ের এত বড় একটি অফিস পরিচালনা করা তার জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং অফিস পরিচালনায় তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।

একই সময় তিনি দাবি করেন, সকাল থেকেই তিনি প্রায় ৪০ জন সাংবাদিককে বিদায় করেছেন। অথচ তখন ঘড়ির কাঁটায় সময় ছিল মাত্র পৌনে ১১টা।

আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এছাড়া তিনি জানান, তিনি মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে এই অফিসে যোগদান করেছেন। তবে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি এক মাসেরও বেশি সময় আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার দেওয়া একাধিক বক্তব্য বাস্তব তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সরাসরি আবেদনকারীদের হয়রানি, দালালদের জন্য ‘সবুজ সংকেত’

সরেজমিনে বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিডি বিপুল কুমার গোস্বামী যোগদানের পর থেকে সরকারি নিয়মে আবেদন করতে আসা সাধারণ মানুষকে নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিসে দালাল সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে সরাসরি আবেদন জমা দিতে গেলে একের পর এক ভুল দেখিয়ে আবেদন ফেরত দেওয়া হয়। অথচ একই আবেদন দালালের মাধ্যমে জমা দিলে কোনো আপত্তি ছাড়াই গ্রহণ করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাধারণ আবেদনকারীদের নানা ত্রুটি দেখিয়ে দিনের পর দিন ঘুরানো হলেও দালালদের মাধ্যমে আসা আবেদনপত্রে সেই একই ত্রুটি আর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

‘মুরুব্বি’ আবেদন পরীক্ষকের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দ্বিতীয় তলায় আবেদন যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা এক প্রবীণ কর্মচারী প্রতিবার নতুন নতুন অজুহাতে আবেদনকারীদের ফিরিয়ে দেন।

গ্রাহকদের অভিযোগ, কেউ সরাসরি আবেদন নিয়ে এলে কখনো বানান, কখনো কাগজপত্র, আবার কখনো অপ্রয়োজনীয় কারণ দেখিয়ে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত ঘুরানো হয়। এমনকি আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও আক্রমণাত্মক আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে, দালালদের মাধ্যমে আসা আবেদনপত্র তিনি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গ্রহণ করে ছবি তোলার জন্য পাঠিয়ে দেন বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।

দালাল ছাড়া যেন মিলছে না পাসপোর্ট সেবা

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে সরকারি নিয়মে আবেদন জমা দিতে গেলে সহজ কাজকেও জটিল করে তোলা হয়। কিন্তু দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গেলে শত ভুল বা জটিলতা থাকলেও আবেদন সহজেই গ্রহণ করা হয়।

এই হয়রানি থেকে বাঁচতে সাধারণ গ্রাহকদের সরকারি ফি-এর বাইরে প্রতি পাসপোর্টে অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর দালালদের সঙ্গে মোট চুক্তির পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

প্রতিটি ফাইলে ‘অফিস খরচ’—দালালদের বিস্ফোরক দাবি

দুইজন দালাল দাবি করেন, অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের মধ্য থেকে প্রতি আবেদনপত্রে এক হাজার থেকে বারোশ টাকা প্রতিদিন বিকেলে “অফিস খরচ” হিসেবে ডিডি স্যারের পিএ-এর কাছে জমা দিতে হয়।

আরও কয়েকজন দালালের ভাষ্য, বর্তমান উপ-পরিচালক যোগদানের পর পাসপোর্টে যত জটিলতাই থাকুক না কেন, তাদের মাধ্যমে শতভাগ সমাধান সম্ভব হচ্ছে।

একজন দালাল বলেন, অফিসের ভেতরের কর্মকর্তারা তাদের ফাইল সহজেই চিনে ফেলেন এবং প্রতিটি পাসপোর্টের বিপরীতে নির্ধারিত হারে টাকা জমা দেওয়া হয়।

প্রতিদিন লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

সরেজমিন অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সরকারি কার্যদিবসে জমা পড়া মোট আবেদনপত্রের প্রায় ৬০ শতাংশই দালালদের মাধ্যমে জমা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব আবেদন থেকে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন বা ঘুষ বাণিজ্য সংঘটিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

দ্রুত পাসপোর্টের প্রলোভন, অসহায় সাধারণ মানুষ

অফিসের আশপাশে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের বিভিন্ন পরিচয় দিয়ে দ্রুত পাসপোর্ট করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।

অনেক ভুক্তভোগী জানান, অনলাইন আবেদন, তথ্য সংশোধন, ছবি তোলা কিংবা পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ বিভিন্ন ধাপে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। পরে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অফিসের ভেতর ও বাইরের কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবার মান উন্নয়ন, দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপ-পরিচালক (ডিডি) বিপুল কুমার গোস্বামীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ থাকলে তা একই গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সরেজমিন অনুসন্ধান, ভুক্তভোগী, স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়। সমতল মাতৃভূমি’র অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। গ্রাহক হয়রানি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চলমান থাকবে। বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।