বৃহস্পতিবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চাকরির স্বপ্ন, শেষ ঠিকানা যুদ্ধক্ষেত্র, প্রলোভনের ফাঁদে তরুণদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই ১৬, ২০২৬ ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মস্কোর শপিংমলে নিরাপত্তাকর্মী, নির্মাণ প্রকল্পে মোটা বেতনের চাকরি—এমন লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে তরুণদের। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বদলে যাচ্ছে সবকিছু। চাকরির বদলে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ রণাঙ্গনে। কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে, কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন, কেউ নিখোঁজ, আবার কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই ভিডিও বার্তায় তুলে ধরছেন ভয়ঙ্কর প্রতারণার বর্ণনা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতারণা নয়; বরং চাকরির আড়ালে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার ও ‘যুদ্ধ-বাণিজ্যের’ ভয়ঙ্কর চক্র। একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সঙ্গে ‘হক ইন্টারন্যাশনাল’ সহ কয়েকটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান এবং দালাল নেটওয়ার্কের নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, হক ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ভিসা প্রসেসিং করা হলেও পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন জনৈক এসএম আরিফ চৌধুরী। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আরাফাত ও জালাল পাটোয়ারী। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা দালালদের মাধ্যমে বেকার তরুণদের সংগ্রহ করে তাদের সামনে মাসে লাখ টাকা বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখানো হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরই শুরু হয় প্রতারণার দ্বিতীয় অধ্যায়।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মস্কোতে পৌঁছানোর পরপরই কর্মীদের পাসপোর্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় চক্রটি। এরপর তাদের এমন ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যারা রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য লোক সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে জোর করে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে হাতে তুলে দেওয়া হয় অস্ত্র। ন্যূনতম প্রশিক্ষণের পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে।

যারা আপত্তি জানান, তাদের ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, অনেকের খাবার পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে নিজেদের দায় এড়িয়ে এসব অভিযোগ স্বীকার করেছে হক ইন্টারন্যাশনাল।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, চাকরির নামে বিদেশে পাঠানোর এই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে হক ইন্টারন্যাশনাল। এই রিক্রুটিং এজেন্সি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালদের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে। তরুণদের মাসে লাখ টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিসা প্রসেসিং সম্পন্ন করে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু মস্কোতে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে রুশ সামরিক সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে স্থানান্তর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

জয়পুরহাটের পাঁচবিবির সোহেল রানা, যিনি বর্তমানে রাশিয়ার যুদ্ধাঞ্চলে অবস্থান করছেন, ভিডিও বার্তায় দাবি করেন—বাংলাদেশে যে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কিছুই মেলেনি। তার ভাষ্য, ফ্লাইটের ঠিক আগে নতুন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়, যেখানে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি নির্ধারণ করা হয় মাত্র ১ ডলার ৯০ সেন্ট। তখন আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ ছিল না।

সোহেলের দাবি, তারা সাতজন একসঙ্গে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তাদের তিনজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর, মাদারীপুরের সুরুজ কাজী এবং কুমিল্লার ইউসুফ মজুমদার।

ভিডিও বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, চাকরির নামে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট এজেন্সি হক ইন্টারন্যাশনাল, এসএম আরিফ চৌধুরী ও তার সহযোগী দালালচক্র।

অভিযোগের বিষয়ে হক ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইনামুল হক বলেন, “আমরা কেবল সরকারি নিয়ম মেনে ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ করি।” তার দাবি, কর্মী সংগ্রহ ও বিদেশে পাঠানোর অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এসএম আরিফ চৌধুরী ও তার সহযোগীরা, যারা সবাই দালাল। তবে কতজন কর্মী তাদের মাধ্যমে রাশিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি। অন্যদিকে এসএম আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে জানান, চাকরির চুক্তিতে রাশিয়ায় গিয়ে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনা সামনে আসার পর তিনটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ায় মানবপাচারের অভিযোগে আর এস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮), জাবাল-ই-নূর (আরএল-২৫০৫) এবং টিএস ওভারসিস লিমিটেড (আরএল-১৭৫৫)-এর লাইসেন্স বাতিল করেছে বিএমইটি। তবে হক ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুসন্ধানেও চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে পাঠানোর অভিযোগ উঠে এসেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিছু ট্রাভেল ও রিক্রুটিং নেটওয়ার্ক প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব, পরে সেখান থেকে রাশিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর বেসামরিক চাকরির পরিবর্তে সামরিক কাজে বাধ্য করা হয়। যারা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাভিত্তিক কয়েকটি ভ্রমণ সংস্থাও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব, পরে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সামরিক ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয় তরুণদের।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার হুমায়ুন কবির মাসে আড়াই লাখ টাকা বেতনের আশ্বাসে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হওয়ার কিছুদিন পরই পরিবার তার মৃত্যুসংবাদ পায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের ২৫ বছর বয়সী আকরাম হোসেনকে ওয়েল্ডারের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। নয় মাস পর পরিবার জানতে পারে, ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের আলী হাসান সোহেলকে নির্মাণ শ্রমিকের কাজের কথা বলে সাত লাখ টাকায় রাশিয়ায় পাঠানো হয়। বিমানবন্দরে নামার পরই তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হলে ড্রোন হামলায় আহত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন পরিবারের কাছে।

একইভাবে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য নজরুল ইসলামকে মস্কোর একটি শপিংমলে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণের পর তাকে জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর পরিবার তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে।

সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক অনুসন্ধানেও একই চিত্র উঠে এসেছে। লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমান ও মুন্সীগঞ্জের মোহন মিয়াজীসহ কয়েকজন বাংলাদেশি জানিয়েছেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। এরপর ড্রোন যুদ্ধ ও ভারী অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে জানান, দালালরাই তাদের বিক্রি করে দিয়েছে।

সিআইডির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাভিত্তিক কিছু ভ্রমণ সংস্থা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব এবং পরে রাশিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে সামরিক ছাউনিতে স্থানান্তরের পর যারা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ওপর চলে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

সরকারি সূত্র বলছে, বৈধ চ্যানেলে গত কয়েক বছরে প্রায় ১২০০ কর্মী রাশিয়ায় গেছেন এবং তারা নিরাপদ রয়েছেন। অর্থাৎ সংকটটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নয়; বরং বেসরকারি দালাল ও অসাধু ভ্রমণ সংস্থার নিয়ন্ত্রিত অবৈধ নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে। জনশক্তি ব্যুরোর তদারকির ফাঁক গলে এই চক্র কীভাবে সক্রিয় রয়েছে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
আইন-আদালত সর্বশেষ