ছবি-সংগৃহীত
ডিজেলের দাম প্রায় চার বছর আগের জায়গায় ফিরে এলেও বাসভাড়ার গ্রাফ যেন অন্য গল্প বলছে—এক রহস্যময় ঊর্ধ্বগতি, যা যাত্রীদের মনে তৈরি করছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। ২০২২ সালের আগস্টে হঠাৎ করেই ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪ টাকায়। সেই ধাক্কায় ঢাকায় বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বেড়ে হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা।
পরবর্তী সময়ে ডিজেলের দাম ধাপে ধাপে কমে ১০০ টাকায় নামলে ভাড়াও কিছুটা নেমে আসে—২ টাকা ৪২ পয়সায়। কিন্তু এবার, ডিজেলের দাম আবার ১১৫ টাকায় উঠতেই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা। অর্থাৎ, আগের তুলনায় জ্বালানির দাম প্রায় সমান হলেও ভাড়া বেড়েছে আরও কয়েক পয়সা—যা যাত্রীদের কাছে অস্বস্তিকর এক বৈপরীত্য।
শুধু নগর পরিবহন নয়, দূরপাল্লার বাসেও একই চিত্র। ৫২ আসনের বাসের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা, যদিও বাস্তবে ৪০ আসনের বাসে সেই ভাড়া দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ টাকা ৯০ পয়সা। ঢাকায় থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ১১৫ কিলোমিটারের যাত্রায় ভাড়া বেড়েছে ২৪ টাকা—৩১০ থেকে ৩৩৪ টাকায়।

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভাড়া নির্ধারণ কমিটি কিলোমিটারপ্রতি ২২ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করলেও সরকার তা কমিয়ে ১১ পয়সা বাড়িয়েছে। পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এবং তারা এটি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে অতীতে এমন সিদ্ধান্ত অমান্যের নজির থাকায় কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই ভাড়াবৃদ্ধির পেছনে যে ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে, তা যেন আরও রহস্য জাগায়। একটি বাসের বছরে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় সোয়া ১০ লাখ টাকা, টায়ার পরিবর্তনে প্রতি তিন মাসে ২৬ হাজার টাকা, ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা—সংখ্যাগুলো যেন বাস্তবতার চেয়ে অনেকটাই ভারী। এমনকি বাসের ‘সৌন্দর্য রক্ষায়’ বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবহন মালিকদের কেউ কেউ স্বীকার করেছেন—প্রতি বাসে বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা চাঁদা ও ঘুষ বাবদ খরচ হয়, যা সরকারি হিসাবের বাইরে। ফলে প্রকৃত খরচ আড়াল করতে অন্য খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এত বিপুল পরিমাণে রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তাহলে রাস্তায় চলা বাসগুলোর অবস্থা এত জীর্ণ-শীর্ণ হতো না। শ্রমিকদের বেতন কাঠামো নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন—আইন অনুযায়ী মাসিক বেতনে নিয়োগ বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
সব মিলিয়ে, বাসভাড়ার এই উত্থান যেন শুধু জ্বালানির দামের গল্প নয়—এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক জটিল হিসাব, অদৃশ্য ব্যয়, আর যাত্রীদের নীরব দীর্ঘশ্বাসের এক অজানা কাব্য।
