টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
চোখের সামনত পলকের মধ্যে চলি গেল বাপ-দাদার বসতভিটা। মুই কিছুই করবার পানু না, খালি চাইয়া চাইয়া দেখনু। সারারাত ঘুম জাগি, ঘরের মালছামানা ও চালের টিন খুলি নিছম। তা না হলে ঘর সমেত নদীত চলি গেল হয়। সিমেন্টের খুঁটিগুলা সরবার লোক পাম নাই। এখন আর ক্যাইও আইসে না। ভোট আইলে কত কথা কয়। হ্যামরা কারও দোষ দেই না। সগ হ্যামর কপালের দোষ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী মো. ফরমান আলী। সোমবার তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে মুহূর্তের মধ্যে বাপ-দাদার শেষ স্মৃতিচিহ্ন বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে নিজের অসহায়ত্বের কথা এভাবেই তুলে ধরেন তিনি।
টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ফরমান আলী জানান, এর আগেও পাঁচবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তারা। তিস্তার চরে এই ভিটাটিই ছিল পূর্বপুরুষের শেষ স্মৃতি। প্রতি বর্ষায় নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটলেও বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
এক সপ্তাহে বিলীন দুই শতাধিক বসতভিটা, পাঁচ শতাধিক একর ফসলি জমি
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর পাড় ধসে পড়ার আতঙ্কে ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চরাঞ্চলের মানুষ।
পানি বাড়তে থাকায় তিস্তার চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে কোনো সরকারি কর্মকর্তা যাননি।
ভাঙনের মুখে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চরাঞ্চলের মানুষ। ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয়দের দাবি, গত এক সপ্তাহে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ি, ভোরের পাখি চরসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক বসতভিটা, পাঁচ শতাধিক একর ফসলি জমি এবং রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও হাজারো বসতভিটা, শত শত একর কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা।
সবচেয়ে বেশি ভাঙন পাঁচ ইউনিয়নে
বর্তমানে কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চণ্ডীপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। জিওব্যাগ ফেলার কাজও আপাতত বন্ধ রয়েছে।
জনপ্রতিনিধিদের দাবি—স্থায়ী সমাধান ছাড়া রক্ষা নেই
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের মুখ থেকে ঘরবাড়ি সরাতে গিয়ে চরবাসী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেননি। তিনি দ্রুত স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানান।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ইউনিয়নের লালচামার, ফুলমিয়ার মোড়, উজান ও ভাটি বোচাগাড়ি এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নিমেষেই বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও রাস্তাঘাট নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
কানিচরিতাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন ও সংরক্ষণের বিকল্প নেই। শুধু জিওটিউব বা জিওব্যাগ দিয়ে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে একসময় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন, কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি চরে ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাদের সহায়তা দেওয়া হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে নদীতে পানি বাড়ায় ভাঙন কিছুটা কমেছে। নতুন করে ভাঙন দেখা দিলে জিওটিউব ও জিওব্যাগ ফেলার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। তবে নদী খনন, ড্রেজিং ও নদীশাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়।
প্লাবিত চরাঞ্চল, নৌকাই এখন ভরসা
উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে তিস্তার চরাঞ্চলের নিচু এলাকা ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। তবে পানি বৃদ্ধি পেলেও সুন্দরগঞ্জ অংশে তিস্তার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও তিস্তার ভয়াল ভাঙন কেড়ে নিচ্ছে মানুষের আজীবনের সঞ্চয়, বাপ-দাদার স্মৃতি আর নিরাপদ আশ্রয়। চরবাসীর একটাই দাবি—অস্থায়ী নয়, তিস্তা নদীশাসনের স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ।
