জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের ফিটলিস্ট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই টেলিফোনে ডেকে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের দুই ব্যাচের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিযোগে প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা নোটিশ বোর্ডে কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। অথচ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ডিসি নিয়োগের ফিটলিস্ট তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো এবং সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করার কথাও বলা আছে।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়ম না মেনেই প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে বাছাই করে সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়। এতে অনেক কর্মকর্তা বিষয়টি জানতেই পারেননি। নিয়ম অনুযায়ী ওই ব্যাচগুলোর সব কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অতীতে আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মেধাতালিকার ক্রম অনুসারে সব কর্মকর্তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হতো। কেউ কেউ ব্যক্তিগত কারণে অনুপস্থিত থাকলেও ডাকার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ ছিল না।
সূত্র মতে, গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ২৮তম ব্যাচের ৪৮ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই ব্যাচে মোট কর্মকর্তা রয়েছেন ১৮৪ জন। ৯ ও ১২ এপ্রিল ২৯তম ব্যাচের ৫১ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যেখানে মোট কর্মকর্তা ১৮৮ জন। দুই ব্যাচ মিলিয়ে ৯৯ জনকে ডাকা হলেও প্রায় ৯০ জন সাক্ষাৎকারে অংশ নেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মচারীদের পদায়ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ডিসি নিয়োগের তালিকা প্রণয়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং জনপ্রশাসন সচিব সদস্য সচিব হিসেবে থাকেন।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও ভূমি সচিব কমিটির সদস্য।
নীতিমালা অনুযায়ী, এই কমিটি প্রয়োজনে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব বা বিভাগীয় কমিশনারদের সহায়তায় বোর্ড গঠন করে প্রার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান, উপস্থাপনা দক্ষতা, মেধা, ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল হায়াত মো. রফিক বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
ভোলা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিন্টু বেপারী বলেন, আমি কোনো চিঠি পাইনি। টেলিফোনে জানানো হয়েছিল, সে অনুযায়ী গিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছি।
ডিসি পদে আগ্রহী একাধিক কর্মকর্তা বলেন, “সবাই ডিসি হবেন না—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ফিটলিস্ট তৈরির প্রক্রিয়ায় এমন গোপনীয়তা ও নিয়ম ভঙ্গ আগে দেখা যায়নি। তারা আরও বলেন, সরকার চাইলে আরও বিস্তৃত যাচাই-বাছাই করতে পারে, এমনকি বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমেও তা করা সম্ভব। কিন্তু নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফিটলিস্ট প্রণয়ন কমিটির এক সদস্য বলেন, ডিসি নিয়োগের বিষয়টি অনেকাংশেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিকভাবে যেভাবে সিদ্ধান্ত আসে, সেই অনুযায়ী প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।
একজন সাবেক সচিব বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে প্রার্থীদের ডাকা উচিত। অতীতেও এই নিয়ম মেনে চলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ডিসি একজন জেলার প্রধান প্রশাসনিক, রাজস্ব ও ম্যাজিস্ট্রেটিয়াল কর্মকর্তা হিসেবে সরকারের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের কর্মস্থল থেকে ঢাকায় সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হলে নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা অনুযায়ী পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক চিঠি ছাড়া উপস্থিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ডিসি হওয়ার জন্য ইউএনও, এডিসি, ডিডিএলজি বা সমমানের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। পাশাপাশি গত পাঁচ বছরের গোপনীয় প্রতিবেদন সন্তোষজনক হওয়া, প্রশাসনিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, আইসিটি জ্ঞান এবং বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা থাকা আবশ্যক।
এদিকে, আলোচিত কয়েকজন কর্মকর্তাও সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক থাকা একজন উপসচিব এবং ভুয়া সনদ ব্যবহারের অভিযোগ থাকা আরেক কর্মকর্তা।
সব মিলিয়ে, ডিসি নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিয়ম মানা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের পদে নিয়োগে অনিয়ম হলে প্রশাসনের ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
