দেশে প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি মানুষের ঝোঁক যত বাড়ছে, ততই নিঃশব্দে ঘনীভূত হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির কালো মেঘ। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র—দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার এসব খাবার গ্রহণ করেন। অথচ বাজারে থাকা পণ্যের ৬৩ শতাংশেই রয়েছে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম), যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, চিপস, চানাচুর, নুডলস, বিস্কুট ও চকলেটের মতো জনপ্রিয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে অনেকাংশে। আরও উদ্বেগের বিষয়—অনেক পণ্যের মোড়কেই এসব উপাদানের স্পষ্ট তথ্য অনুপস্থিত, ফলে ভোক্তারা অজান্তেই ঝুঁকির অন্ধকারে পা বাড়াচ্ছেন।
রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল): প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সাংবাদিক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় উঠে আসে খাদ্যনিরাপত্তার এই অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিশ্লেষণে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য মিলেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম লজেন্সে চিনি রয়েছে ৪৩ গ্রাম—যেখানে নির্ধারিত সীমা ২৫ গ্রাম। একইভাবে, ১০০ গ্রাম ডাল ভাজায় লবণের পরিমাণ ৬.১ গ্রাম, যা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিস্কুট ও মিল্ক চকলেটে ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উপস্থিতিও উদ্বেগজনক মাত্রায়।
সমস্যার গভীরতা আরও বাড়িয়েছে পুষ্টিগত তথ্যের ঘাটতি। প্রায় ৪৬ শতাংশ পণ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৩৮ শতাংশে ট্রান্স ফ্যাট এবং ২১ শতাংশে চিনি ও লবণের তথ্যই নেই। এমনকি কোনো প্যাকেটেই উপাদানগুলোর পরিমাণ সহজবোধ্যভাবে উল্লেখ করা হয়নি—যা ভোক্তার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগের প্রকোপ ভয়াবহ—প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদ্রোগে প্রাণ হারান। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই এসব রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল)’ যেন এক আলোর দিশা হয়ে উঠছে। প্যাকেটের সামনে ‘উচ্চ’ বা ‘অতিরিক্ত’ সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তারা সহজেই খাদ্যের ঝুঁকি বুঝতে পারবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি‘বেস্ট বাই’উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।বাংলাদেশেও এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খাদ্যশিল্পের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতা এ উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সরকার দ্রুত এফওপিএল চালুর দিকে এগোচ্ছে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীমের মতে, অসংক্রামক রোগ কমাতে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি, আর এফওপিএল সে পথকে সহজ করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাত বলেন, এই উদ্যোগ দেশের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ মনে করেন, এফওপিএল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বজায় রাখতে পারে। জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, এফওপিএল চালু হলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমবে এবং স্বাস্থ্য ব্যয়ও হ্রাস পাবে।
স্বাস্থ্য সচেতনতার এই সন্ধিক্ষণে, প্যাকেটজাত খাদ্যের চকচকে মোড়কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি যেন আর অদেখা না থাকে—এটাই এখন সময়ের দাবি।
