চুক্তি অনুযায়ী জলাশয় পুনরুদ্ধার, নাকি পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রশ্নে পদ্মা রেল প্রকল্প। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর পিলারের নিচ থেকে এভাবেই মাটি কেটে নেওয়া হয়। ছবি : সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল ভায়াডাক্টের পিলারের নিচ থেকে মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসন মাটি কাটা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কোনো অনিয়ম নয়; বরং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রাকৃতিক জলাশয় পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবেই মাটি অপসারণ করা হচ্ছিল।
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে নির্দেশনা এসেছে, এখানে আর মাটি কাটা হবে না, বরং এলাকাজুড়ে বৃক্ষরোপণ করা হবে।
কেন কাটা হচ্ছিল মাটি?
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জলাশয় রক্ষার স্বার্থে নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় অতিরিক্ত ব্যয়ে ভায়াডাক্টের ওপর উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় আলীগঞ্জের বিলে ভারী যন্ত্রপাতি, ক্রেন ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের জন্য মাটি ফেলে অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করা হয়। সেই রাস্তা ব্যবহার করেই পাইলিং ও পিলার নির্মাণ এবং ভায়াডাক্টের কংক্রিট সেগমেন্ট স্থাপন করা হয়।
প্রকল্পের চুক্তিতে স্পষ্ট শর্ত ছিল, নির্মাণকাজ শেষে অস্থায়ী রাস্তা অপসারণ করে জলাশয়কে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। সেই শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই মাটি কাটা হচ্ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এর আগেও কেরানীগঞ্জে একই ধরনের অস্থায়ী সড়ক কেটে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে এবার সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়ে রেল কর্তৃপক্ষ মাটি অপসারণের পরিবর্তে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়টি স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং পানি চলাচল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় বিতর্ক
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পদ্মা রেল সেতুর উড়াল অংশ নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জের ওপর দিয়ে গেছে। এর ৭৬ থেকে ৯০ নম্বর পিলার পাগলার আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। গত ১৩ জুন ৮৬ থেকে ৯০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী অংশে বিশাল কাটিং মেশিন দিয়ে মাটি কাটার কাজ শুরু করে চীনা কোম্পানির নিয়োজিত কর্মীরা।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় এক যুবদল নেতার কয়েকজন সমর্থক সেখানে গিয়ে মাটি কাটার অনুমতি আছে কি না জানতে চান। কোম্পানির কর্মীরা অনুমতির কাগজপত্র দেখিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ
সেদিন বিকেলেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামানকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তিনি জানান, সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী। যারা মাটি কাটছিলেন, তারা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, মাটি অপসারণ এই প্রকল্পের কাজেরই অংশ। তবে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের বক্তব্য
বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে এমন মাটি কাটার অনুমোদন দেয় না। এটি কে, কেন করেছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষই তা বলতে পারবে।
অন্যদিকে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উপপরিচালক আমিনুল করিম বলেন, ৭৬ থেকে ৯০ নম্বর পিলার পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার এলাকা আগে বিল বা জলাশয় ছিল। ভায়াডাক্ট নির্মাণের সময় মালামাল পরিবহনের জন্য জলাশয় ভরাট করা হয়েছিল। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অংশ হিসেবে আবার মাটি কেটে জলাশয় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এতে পিলারের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
তিনি আরও জানান, কেরানীগঞ্জেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে এবং এটি চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিরই অংশ।
স্থানীয়দের দাবি: রাস্তা থাকুক
বর্তমানে ভরাট করা স্থানটি স্থানীয়রা রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাই কুতুবপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু এলাকাটিকে রাস্তা হিসেবেই রেখে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসকের ব্যাখ্যা
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, আসলে নিয়মিত মাটি কাটা হয়নি; মাত্র একদিন, ১৩ জুন কাজটি হয়েছে। সেদিনই আমরা তা বন্ধ করে দিয়েছি। তারা জানিয়েছে, ভায়াডাক্ট নির্মাণের জন্য অস্থায়ীভাবে মাটি ফেলে জায়গা উঁচু করা হয়েছিল, এখন কাজ শেষ হওয়ায় সেই মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টি তাদের চুক্তির অংশ হলেও জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া মাটি অপসারণ করা যাবে না।
সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য
সচিবালয়ে এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মাটি খুঁড়ে নেওয়া হয়েছে, বিষয়টা ঠিক সে রকম নয়। কিছু প্রতিবন্ধকতা রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি সরানো হয়েছে।
