১৫ জুনের অভিযোগের পরও নীরব নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম — নীরবতা কি আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতি, নাকি বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল?
শতকোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। টেন্ডার মূল্যায়নে অনিয়ম, কাজ না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ, আর এর মাঝেই দীর্ঘ নীরবতায় গণপূর্তের আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম। সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়ছে জল্পনা-কল্পনা।
ঢাকার বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেরররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রিভেনশন সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ১৪ কোটি টাকার টেন্ডারকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তা থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের শেরেবাংলা নগর বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া দেননি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
গত ১৫ জুন প্রকাশিত অভিযোগভিত্তিক প্রতিবেদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও বিষয়টি নিয়ে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সংবাদ সম্মেলন, লিখিত ব্যাখ্যা কিংবা গণমাধ্যমে বিস্তারিত বক্তব্য না আসায় আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
অভিযোগের পাহাড়, কিন্তু নীরব কর্মকর্তা
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৪ কোটি টাকার আলোচিত টেন্ডারে যোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক দরদাতাদের অযোগ্য ঘোষণা করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। টেন্ডার মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে সামনে এসেছে স্বাস্থ্য খাতের প্রায় ৭৮ লাখ টাকার সংস্কার কাজ নিয়ে নতুন অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে কাজ সম্পূর্ণ না হলেও কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জহুরুল ইসলামের অবস্থান জানতে বিভিন্ন মহল আগ্রহী হলেও এখন পর্যন্ত তার নীরবতা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের প্রশ্ন, যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়ে থাকে, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কেন প্রকাশ্যে এসে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না?
আবার অন্য একটি পক্ষের মত, প্রশাসনিক বা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কারণে তিনি হয়তো প্রকাশ্যে মন্তব্য করা থেকে বিরত আছেন। ফলে তার নীরবতাকে সরাসরি দোষ স্বীকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় অঙ্কের সরকারি প্রকল্পে এমন গুরুতর অভিযোগের পরও দীর্ঘ সময় নীরব থাকা স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
টেন্ডার বিতর্কের আগুনে নতুন ঘি
টেন্ডার আইডি ১২৬৭০৮৪-এর আওতায় প্রায় ১৪ কোটি টাকার কাজ নিয়ে যে আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, সেখানে অভিযোগকারীরা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা প্রকৃত প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা এখনও কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়নি।
৭৮ লাখ টাকার বিল: মাঠের বাস্তবতা বনাম কাগজের হিসাব
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কাজের জন্য বরাদ্দ পাওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকা নিয়ে ওঠা অভিযোগও এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু স্থানে কাজ আংশিক সম্পন্ন হলেও সরকারি নথিতে শতভাগ কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বলছে, সব কাজ নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং যথাযথ প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এই দুই বিপরীত দাবির মধ্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
গণপূর্তে কি আরও বড় কোনো চিত্র লুকিয়ে আছে?
সচেতন মহলের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তাকে ঘিরে একের পর এক টেন্ডার ও বিল সংক্রান্ত অভিযোগ কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বিস্তৃত কোনো অনিয়মের চিত্র?
একাধিক প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করছেন, অভিযোগগুলো দ্রুত যাচাই করা না হলে গণপূর্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনমনে আরও প্রশ্ন তৈরি হবে।
এখন সবার চোখ প্রধান প্রকৌশলীর সিদ্ধান্তে
অভিযোগগুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামের দীর্ঘ নীরবতা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। আবার অভিযোগগুলো উপেক্ষা করাও জনস্বার্থের পরিপন্থী। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, সত্য উদঘাটনের একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তথ্যভিত্তিক জবাবদিহিতা।
১৫ জুনের অভিযোগের পরও জহুরুল ইসলামের নীরবতা বিতর্ককে থামাতে পারেনি; বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—তিনি কি প্রকাশ্যে এসে অভিযোগগুলোর জবাব দেন, নাকি তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন।
এছাড়াও জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে নানা ধরনের অভিযোগের খবর। তবে একটি প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে—জহুরুল ইসলামের নীরবতা কি শুধুই প্রশাসনিক কৌশল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো অজানা গল্প? এমনটাই এখন ভাবিয়ে তুলেছে গোটা নেটিজেনদের।
