বৃহস্পতিবার, ২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফাঁকা ঢাকায় ঈদ, কিন্তু রাস্তায় ‘বখশিস আতঙ্ক’ যানজটহীন রাজধানীতে স্বস্তি, আর ভাড়ার চাপে নগরবাসীর দীর্ঘশ্বাস

আবদুর রহমান
মে ২৮, ২০২৬ ৮:০৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট ফাঁকা। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল আজহায় লাখো মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। ফলে বছরের অন্য সময়ের ব্যস্ততম রাজধানী এখন অনেকটাই নিরিবিলি। ফাঁকা সড়ক, নেই দীর্ঘ যানজট, নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার বিরক্তি। যারা ঢাকাতেই ঈদ উদযাপন করছেন, তাদের চলাফেরাও হওয়ার কথা ছিল স্বস্তির।

কিন্তু সেই স্বস্তির মাঝেই নগরবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তি হয়ে উঠেছে বাড়তি ভাড়া। বাস, সিএনজি, অটোরিকশা থেকে শুরু করে রিকশা—প্রায় সব ধরনের যানবাহনেই ‘ঈদের বখশিস’ নামে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঈদের দিন সকাল থেকেই রাজধানীজুড়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।

ফাঁকা রাস্তা, কিন্তু ভাড়ায় অরাজকতা

বিকেলে পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় পরিবার নিয়ে বের হয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার হোসেন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আত্মীয়ের বাসায় যাওয়া এবং পরে কিছুটা ঘোরাঘুরি করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু রাস্তায় নেমেই পড়তে হয় ভিন্ন বাস্তবতায়।

তার ভাষায়, গাড়ি কম, চালকও কম। আর যারা আছে, তারা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি চাইছে। কেউ বলছে ‘ঈদের বখশিস দেন’, কেউ বলছে ‘আজকে ঈদের দিন, একটু খুশি করেন।’ অল্প দূরত্বেও ৮০ থেকে ১০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ফার্মগেট এলাকার ব্যবসায়ী সোলায়মান আহমেদ। তেজগাঁও সাতরাস্তা পর্যন্ত যেতে অন্যদিন যেখানে ৩০ টাকায় রিকশা পাওয়া যায়, ঈদের দিনে সেখানে ৫০ টাকার নিচে যেতে রাজি হয়নি কোনো চালক। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে তাকে।

রাজধানীর সর্বত্র একই চিত্র

শুধু শেওড়াপাড়া বা ফার্মগেট নয়—রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই দেখা গেছে একই অবস্থা।

মিরপুর-১, মিরপুর-১০, ইসিবি চত্বর, কাজীপাড়া, কালশী, কুড়িল, রামপুরা, বনশ্রী, কুর্মিটোলা, নতুন বাজার, নর্দা, পল্টন, নয়াপল্টন ও সেগুনবাগিচা ঘুরে দেখা গেছে—রিকশাচালকেরা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাবি করছেন।

সিএনজি চালকদের দাবি আরও চড়া। অনেকেই ৩০০ টাকার নিচে কোথাও যেতে রাজি হচ্ছেন না। ভাড়ার মোটরসাইকেলেও নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। যাত্রীদের অভিযোগ, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কাছ থেকেও বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক চালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সময় দুর্ব্যবহারও করছেন।

মেট্রোরেল বন্ধ, ভোগান্তি আরও বেড়েছে

ঈদের ছুটিতে মেট্রোরেল বন্ধ থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন অনেক যাত্রী। নিয়মিত যাতায়াতের সহজ ও নির্ধারিত ভাড়ার এই পরিবহন বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে বিকল্প যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে মানুষকে।

মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আসিফ খান বলেন, বন্ধুদের নিয়ে আগারগাঁও আর সংসদ ভবনের আশপাশে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। মেট্রোরেল খোলা থাকলে সহজেই কম খরচে যাওয়া যেত। এখন বাসে উঠে দেখি জনপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেও কোনো লাভ হয়নি।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান গৃহবধূ সুলতানা বেগম। শিশুসন্তানের অসুস্থতায় কাজীপাড়া থেকে শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে যেতে হয়েছিল তাকে।

এই অবস্থাতেও কেউ মানবিক হয়নি। ৫০ টাকার ভাড়া ৮০ টাকা নিয়েছে,—ক্ষোভ নিয়ে বলেন তিনি।

চালকদের যুক্তি—‘ঈদের দিন পরিবার ছেড়ে রাস্তায়’

তবে চালকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ঈদের দিন পরিবার-পরিজন ছেড়ে যাত্রীসেবা দিতে রাস্তায় থাকতে হচ্ছে বলেই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

মিরপুর-১ এলাকার সিএনজি চালক রহিম শেখ বলেন,

“আমরা নিজেরা পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারিনি। মানুষকে সেবা দিতে রাস্তায় আছি। এই দিনে সামান্য বখশিস চাইলে সেটা খারাপ কেন হবে? সারা বছরে এই উৎসবের সময়টাতেই একটু বেশি আয় করার সুযোগ পাই।

পল্টনের রিকশাচালক আব্দুর রহিমও একই সুরে বলেন,

“সবাই যখন পরিবার নিয়ে আনন্দ করে, তখন আমরা রাস্তায় থাকি। একটু বেশি ভাড়া চাইলে দোষ কোথায়? অনেক যাত্রী আবার খুশি হয়েই বখশিস দেন।”

অন্যদিকে মিরপুর-১২ থেকে গুলিস্তানগামী শিকড় পরিবহনের চালক মো. মামুন বলেন, ঈদের দিনে যাত্রী কম থাকে। বাসের অনেক সিট ফাঁকা যায়। কিন্তু তেল, স্টাফ বেতন—এসব খরচ তো কমে না। তাই অনেক সময় বাড়তি ভাড়া নিতে হয়। তবে কাউকে জোর করে নয়, অনুরোধ করেই নেওয়া হয়।

স্বস্তির শহরে অস্বস্তির যাত্রা-

ঈদের ছুটিতে ফাঁকা ঢাকা যেন এক অন্যরকম শহর—নিরিবিলি, দ্রুতগামী, স্বস্তির। কিন্তু সেই স্বস্তির শহরেই এখন সবচেয়ে বড় অস্বস্তির নাম অতিরিক্ত ভাড়া।

নগরবাসীর প্রশ্ন, উৎসবের আনন্দ কি সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠবে? আর ‘বখশিস’-এর নামে এই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কতটা ন্যায্য—সেই প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজধানীর ফাঁকা রাস্তাজুড়ে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।