সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও অর্থ দাবির অভিযোগ, আইনি ভিত্তি জানতে চাইল রাজউক—নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশ। ফাইল ছবি
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, জমি রেজিস্ট্রি ও হস্তান্তর সম্পন্ন হওয়ার পর সার্ভিস চার্জ বা অন্য কোনো নামে অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজধানীর বনশ্রীতে শেলটেকের একটি আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে প্রায় ৩ কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে দুই আবাসন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে বিষয়টি গড়ায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে। পরে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সার্ভিস চার্জ দাবির আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাজউকের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলতে ইস্টার্ন হাউজিংকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন হাউজিং এবং ৮ সেপ্টেম্বর শেলটেক পৃথকভাবে রাজউকের কাছে আবেদন করে। উভয় প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তরে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সংস্থাটির সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ বশিরুল হক ভূঁইয়া, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক এবং প্রধান নগর স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। শেলটেকের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার শাহজাহান এবং ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পক্ষে নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম শুনানিতে অংশ নেন।
শুনানিতে সার্ভিস চার্জ দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের প্রতিনিধির কাছে প্রশ্ন তোলেন রাজউক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে সার্ভিস চার্জ আদায়ের ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আপনারা কীভাবে এই অর্থ দাবি করছেন? এভাবে টাকা আদায়ের কোনো এখতিয়ার আপনাদের নেই।’
একই বিষয়ে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কাছে আইনি ভিত্তি জানতে চান রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক। কোন আইনের আওতায় এবং কীসের ভিত্তিতে এই সার্ভিস চার্জ দাবি করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ সময় ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাজউকের প্রধান নগর স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান সার্ভিস চার্জ নিলে অন্তত প্রকল্পের নকশা ঠিক থাকছে কি না, সেদিকে লক্ষ্য রেখেছে। কিন্তু আপনারা বনশ্রী বা আফতাবনগরে কোনো কিছুই ঠিক রাখতে পারছেন না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে সার্ভিস চার্জ নিচ্ছেন?’
শুনানি শেষে বিষয়টির সুরাহা এবং সরকারি নীতিমালা অনুসরণের জন্য ইস্টার্ন হাউজিংকে নির্দেশনা দেয় রাজউক। তবে প্রায় ৩ কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ দাবির বিষয়ে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
সার্ভিস চার্জ আদায়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞা
জানা গেছে, আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সার্ভিস চার্জের নামে কাঠাপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। একবার বিক্রি ও হস্তান্তর করা জমির ক্ষেত্রে পুনরায় সার্ভিস চার্জ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠার পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে বিক্রি ও হস্তান্তরিত জমি বা ফ্ল্যাট পরবর্তী সময়ে পুনরায় বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা নামজারির ক্ষেত্রে অনুমোদনের নামে ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না। অন্য কোনো নামেও এ ধরনের অর্থ আদায়কে আইনবহির্ভূত উল্লেখ করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, নির্দেশনা অমান্য করা হলে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বনশ্রীর আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে প্রায় ৩ কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ দাবির অভিযোগ নতুন করে এ ধরনের অর্থ আদায়ের বৈধতা ও আবাসন খাতের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
সার্ভিস চার্জ দাবির বিষয়ে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
