রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন অফিসে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, সব অভিযোগ অস্বীকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার। ফাইল ছবি
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বাড্ডা ও আশপাশের উচ্চমূল্যের জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হস্তান্তর ও নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় এই অফিসকে ঘিরে সবসময়ই সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও নজর থাকে। তবে সম্প্রতি এই কার্যালয়কে কেন্দ্র করে রাজস্ব ফাঁকি, জাল ও ভুয়া দলিল নিবন্ধন, ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, তার দায়িত্বকালীন সময়ে নিবন্ধন কার্যক্রমে নানা ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে এগুলোকে পরিকল্পিত, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, গুলশান, বাড্ডা ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত মূল্যবান আবাসিক ও বাণিজ্যিক জমির প্রকৃত শ্রেণি গোপন করে কম মূল্যের জমি হিসেবে উপস্থাপনের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, উন্নয়নকৃত বা বসতভিটা জমিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখিয়ে নিবন্ধন ফি, কর ও অন্যান্য সরকারি রাজস্ব কমিয়ে আনা হচ্ছে।
ভূমি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি প্রকৃত মূল্য কম দেখানো হয়, তাহলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাতে পারে। কারণ জমির শ্রেণি ও বাজারমূল্যের ভিত্তিতেই নিবন্ধন ব্যয় ও কর নির্ধারিত হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ মে সম্পাদিত একটি সাব-কবলা দলিল (নং-৩৪৫৯)-এ প্রায় ১০ দশমিক ৬৬ কাঠা জমি হস্তান্তর করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, জমিটি প্রকৃতপক্ষে মূল্যবান বসতভিটা হলেও দলিলে সেটিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম রাজস্ব আদায় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি তদন্ত ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন ভূমি প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
লিখিত অভিযোগ, আদালতে মামলা
অভিযোগকারী আবু হানিফ দাবি করেছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে আইন উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন তাতেও কোন প্রকার সুরাহা মেলেনি।
এছাড়া ঢাকা মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পিটিশন মামলা নং-২৫৬/২০২৫ (রামপুরা থানা আমলী) দায়ের করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৪৩৫, ২০১, ৪২৭, ৫০৬(২) ও ৩৪ ধারায় রুজু করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে মামলায় অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও তদন্তের ফলাফলের ওপরই বিষয়টির আইনগত অবস্থান নির্ভর করবে।
‘প্রভাব খাটিয়ে দলিল নিবন্ধন’ ও হয়রানির অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে জমির মালিক বা দাতা পক্ষকে প্রশাসনিক চাপ, আইনি জটিলতার আশঙ্কা কিংবা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে দলিল সম্পাদনে বাধ্য করা হয়।
তাদের মতে, ভূমি ও নিবন্ধন আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সীমিত জ্ঞানের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ণ সম্মতি নিশ্চিত না করেই দ্রুত দলিল নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় কিংবা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে সরব ভুক্তভোগীরা
গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো কথিত ঘুষ বাণিজ্য।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ফি-এর বাইরে বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দলিল নিবন্ধন, কাগজপত্র যাচাই, রেকর্ড প্রস্তুত, নামজারি-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সহায়তার ক্ষেত্রে অলিখিত অর্থ লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিছু ভুক্তভোগী দাবি করেন, নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা প্রদান না করলে ফাইলের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায় অথবা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি দলিল নিবন্ধিত হলেও প্রতিটি দলিলের আর্থিক মূল্য অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এখানে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়। ফলে দুর্নীতির সুযোগও তুলনামূলক বেশি বলে অভিযোগকারীদের ধারণা।
সক্রিয় দালাল সিন্ডিকেট?
অফিস-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি সক্রিয় দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ সেবাগ্রহীতারা সরাসরি কাজ করতে গেলে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার সম্মুখীন হন। অথচ দালালদের মাধ্যমে গেলে তুলনামূলক দ্রুত সেবা পাওয়া যায়।
যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জাল ও ভুয়া দলিল নিবন্ধনের অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর অংশ হলো জাল ও ভুয়া দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি।
অভিযোগকারীদের মতে, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র, অসত্য তথ্য কিংবা মালিকানার ইতিহাস যথাযথভাবে যাচাই না করেই কিছু দলিল নিবন্ধন করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত মালিকদের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
ভূমি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, সামগ্রিক ভূমি প্রশাসনের জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।
নকলনবিশের নামও অভিযোগে
অভিযোগে নকলনবিশ মো. গিয়াস উদ্দিনের নামও উঠে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন এবং কিছু বিতর্কিত দলিল দ্রুত সম্পাদনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। তার সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সব অভিযোগ অস্বীকার সাব-রেজিস্ট্রারের
অন্যদিকে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের সম্পত্তি লেনদেন হয়। ফলে অসন্তুষ্ট পক্ষ কিংবা বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কাছ থেকে অভিযোগ আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই জরুরি।
তদন্তই দিতে পারে প্রকৃত উত্তর
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত।
তারা মনে করেন, সংশ্লিষ্ট দলিল, রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড, জমির শ্রেণি নির্ধারণের নথি, রাজস্ব পরিশোধের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন কার্যালয়কে ঘিরে যখন এত গুরুতর অভিযোগ উঠছে, তখন বিষয়টি শুধু একটি অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে অভিযোগগুলো প্রশাসনিক ও আইনগত যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো আদালত বা সরকারি তদন্ত সংস্থা মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন কিংবা অভিযোগে উল্লিখিত অন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেনি। একইভাবে অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কি না, তাও কোনো স্বাধীন তদন্তে নির্ধারিত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে, দায়ীদের চিহ্নিত করতে এবং ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে।
