রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের এক নীরব সিন্ডিকেট—এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ বাণিজ্যিক সংযোগ ছাড়াই অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাতভর শত শত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু সাধারণ গ্রাহক যখন বাড়তি বিলের চাপ বহন করছেন, তখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অবৈধভাবে রিকশার ব্যাটারি চার্জিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ছে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজধানীতে প্রতিদিনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অবৈধ চার্জিং গ্যারেজের সংখ্যাও। অনেক এলাকায় দিনের বেলায় সাধারণ গ্যারেজের কার্যক্রম দেখা গেলেও গভীর রাতে সেখানে একসঙ্গে অসংখ্য ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এ দৃশ্য দেখে এলাকাবাসী ব্যঙ্গ করে এসব গ্যারেজকে ‘আলাদিনের চেরাগ’ বলে অভিহিত করছেন। তাদের ভাষ্য, একটি ছোট সংযোগ থেকেই যেন অলৌকিকভাবে শত শত ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব অবৈধ সংযোগের কারণে আশপাশের এলাকায় বিদ্যুতের ভোল্টেজ কমে যায়। এতে বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং সাধারণ গ্রাহককে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একই সঙ্গে নিম্নমানের তার, ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ ও অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহার করায় অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্যে এমন কর্মকাণ্ড চললেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান অভিযান খুব একটা দেখা যায় না। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে অসাধু গ্যারেজ মালিকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের নীরব ভূমিকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
সচেতন মহলের মতে, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার শুধু রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা মনে করেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারিভাবে নিবন্ধিত ও বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আধুনিক রিকশা চার্জিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে অবৈধ চার্জিংয়ের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা।
জাতীয় স্বার্থে দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত বা মনিটরিং কমিটি গঠন করে রাজধানীসহ সারাদেশে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জিং গ্যারেজ এবং সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের কার্যক্রম তদন্তের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের নেপথ্যের চক্র, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির চিত্র নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
