রবিবার, ৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হচ্ছে ঝুঁকি নিয়েই, বিদ্যুতের দাম অজানা, স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনায় ধোঁয়াশা, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এখনও অনিষ্পন্ন

আবদুর রহমান
জুলাই ৫, ২০২৬ ৩:৫৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আশার নাম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টের মধ্যেই কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। তবে উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে এসেও কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং পরিচালনা-সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—ঝুঁকিপূর্ণ স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) অপসারণের চূড়ান্ত চুক্তি, বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) চুক্তি এবং জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান ছাড়াই বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে এগোনো ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিচ্ছে রাশিয়া। মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে দেশটি, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম-এর তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ এগিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েকটি অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। তাঁর মতে, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাশিয়া এই স্পেন্ট ফুয়েল পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করবে, স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে, নাকি বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে—সেই বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়। একই সঙ্গে এর ব্যয়ভার কে বহন করবে, তাও অজানা।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) চূড়ান্ত না হওয়ায় বিদ্যুতের প্রকৃত মূল্য নিয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কেন্দ্র পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের বিষয়টিও এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

ড. শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব চুক্তি অনেক আগেই সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল। এখন তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘমেয়াদে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগেই সব চুক্তি সম্পন্ন করে শর্তাবলি জনগণের সামনে প্রকাশ করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সি স্থিতিশীল রাখতে রূপপুর কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান বলেন, বর্তমানে তাদের প্রধান লক্ষ্য নিরাপদভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা। দক্ষ জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে সব কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তি রয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব নয়। তাই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাসের শেষ দিকে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে এবং নভেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুতের দাম এখনও রহস্যে

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু রূপপুরের ক্ষেত্রে সেই চুক্তি এখনও হয়নি।

পিডিবি প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য একাধিকবার চাইলেও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণ সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সহজ নয়। এখানে ঋণের কিস্তি, স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা, ডিকমিশনিং ব্যয়সহ দীর্ঘমেয়াদি নানা বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।

বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম নিয়েও এসেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। ২০২০ সালে প্রতি ইউনিট ৪ থেকে সাড়ে ৪ টাকা বলা হলেও ২০২৩ সালে তা ৭ থেকে ৮ টাকায় উন্নীত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। বর্তমানে শুধু উৎপাদন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৪ টাকা ৩১ পয়সা। তবে এর সঙ্গে রাশিয়ার ঋণের সুদ, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ব্যয় এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ যোগ হলে প্রকৃত মূল্য আরও বাড়তে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করেন, রূপপুরের বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম প্রতি ইউনিট ১১ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করেন, রূপপুরের বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম প্রতি ইউনিট ১১ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। তাই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জাতীয় ঐকমত্য নিশ্চিত করা জরুরি ছিল।

স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা। দেড় থেকে দুই বছর পরপর রিঅ্যাক্টরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়, যা অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় এবং দীর্ঘ সময় বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে।

বাংলাদেশে এ ধরনের বর্জ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় শুরুতে পরিকল্পনা ছিল এগুলো রাশিয়ায় পাঠানো হবে। এ বিষয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমঝোতা থাকলেও স্পেন্ট ফুয়েল গ্রহণ, সংরক্ষণ কিংবা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে এখনও কোনো বাধ্যতামূলক চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। ফলে ভবিষ্যতের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দায় নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

জাতীয় গ্রিড কি প্রস্তুত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা।

পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা দিন-রাতের ব্যবধানে ওঠানামা করে। ফলে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্রিকোয়েন্সি ৪৯ হার্টজের নিচে নেমে গেলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যদিও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) দাবি করেছে, প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। ড. জাহেদুল হাছানও জানান, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

বাকি রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি

রূপপুর কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং জরুরি প্রযুক্তিগত সহায়তা-সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রথম তিন বছর জ্বালানি সরবরাহ করবে। তবে এরপর দীর্ঘমেয়াদে ইউরেনিয়াম সরবরাহের কোনো চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কেন্দ্র চালুর পর এসব বিষয়ে দরকষাকষি করতে হলে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দামেও পড়বে।

ঋণ পরিশোধেও অনিশ্চয়তা

১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পের প্রায় ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এসেছে রাশিয়ার ঋণ থেকে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেন জটিল হয়ে পড়ায় সেই ঋণ পরিশোধ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বর্তমানে রাশিয়ার পাওনা অর্থ সোনালী ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে জমা রাখা হলেও আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে তা রাশিয়ায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। তবে বিদ্যুতের ট্যারিফ, স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তি এবং ঋণ পরিশোধ—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান এখনও বাকি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রাক্কালে প্রকল্পটির নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক টেকসইতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।