শিশু-কিশোরদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা, শিল্পীদের সুরের মূর্ছনা আর মামুনুর রশীদের সম্প্রীতির আহ্বানে উৎসবমুখর পুরান ঢাকা। শরৎ উৎসবে দলীয় নৃত্য। ছবি: সমতল মাতৃভূমি
শরতের শুভ্রতা, সুরের মূর্ছনা, নৃত্যের ছন্দ আর আবৃত্তির আবেশে মিলন ও আনন্দের এক অনন্য আবহ তৈরি হলো পুরান ঢাকায়। প্রকৃতির ঋতুবৈচিত্র্যকে মানুষের মিলন, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চার বন্ধনে আবদ্ধ করার প্রত্যয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘শরৎ উৎসব-১৪৩৩’। শিশু-কিশোরদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা, শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর গান এবং রঙ-তুলিতে শরৎকে ফুটিয়ে তোলার আয়োজনে উৎসব প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। উৎসবের এই মিলনমেলায় শৈশবের সাংস্কৃতিক চর্চার স্মৃতিচারণের পাশাপাশি মানুষে মানুষে দূরত্ব ঘুচিয়ে ঐক্যের বন্ধন দৃঢ় করার আহ্বান জানান বিশিষ্ট অভিনেতা মামুনুর রশীদ।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় পুরান ঢাকার সীমান্ত গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণের সাহারা মঞ্চে সরোদ বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনব্যাপী এ উৎসব। যন্ত্রসংগীতশিল্পী শামীম জহিরের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সূচিত হয় সুরের আবহ। এরপর একে একে মঞ্চে আসে শিশু-কিশোরদের গান, নৃত্য ও আবৃত্তি। একক ও দলীয় সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, আলোচনা এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় সাজানো আয়োজনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শরতের স্নিগ্ধতা ও সাংস্কৃতিক আনন্দ।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে শুরু হয় শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ‘শরৎ ঋতু’ বিষয়ক এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ১০০ শিশু-কিশোর। রং-তুলির আঁচড়ে শরতের প্রকৃতি ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বিভাগে বিজয়ী ১২ জনের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার।
উৎসবে স্বাগত বক্তব্য ও ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সহসভাপতি, লেখক, গবেষক ও নৃত্যশিল্পী অধ্যাপক নিগার চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবক মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী এবং স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউর রহমান দুলু।
স্মৃতিচারণের পাশাপাশি উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে সংযোগ বাড়ানোর তাগিদ দেন অভিনেতা মামুনুর রশীদ
গান, নৃত্য ও আবৃত্তিতে শরতের রঙ
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল একক ও দলীয় সংগীত পরিবেশনা। শিল্পীদের কণ্ঠে গানে গানে উঠে আসে ঋতুর আবহ, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক চর্চার বৈচিত্র্য। একক সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব ঘোষ, অনিমা রায়, ফেরদৌসী কাকলি, রত্না সরকার, মাহমুদুল হাসান, সঞ্জয় কবিরাজ, নবনীতা জাহিদ চৌধুরী অনন্যা, শ্রাবণী গুহ রায়, তামান্না নিগার তুলি, এস এম মেজবা ও শান্তা সরকার। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন নাইলা তারান্নুম চৌধুরী কাকলি ও বেলায়েত হোসেন।
দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় শিশু-কিশোর সংগঠন সীমান্ত খেলাঘর আসর, গেণ্ডারিয়া কিশলয় কচি-কাঁচা মেলা, সুরবিহার ও শিল্পবৃত্ত। নৃত্যের ছন্দে মঞ্চ মাতায় নৃত্যফ, স্পন্দন, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র ও অংশী। এ ছাড়া সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, নির্ঝরিণী একাডেমি ও সুরনন্দনের শিল্পীরা দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
শিশু-কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, শিল্পীদের পরিবেশনা এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাসে উৎসব প্রাঙ্গণে তৈরি হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ। সুর, ছন্দ ও শব্দের মেলবন্ধনে শরতের সৌন্দর্য যেন ধরা দেয় নতুন মাত্রায়।
উৎসবের মূল সুর হোক মানুষের মিলন: মামুনুর রশীদ
‘শরৎ কথন’ পর্বে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অভিনেতা মামুনুর রশীদ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে শৈশবের সাংস্কৃতিক উৎসবের স্মৃতি, সম্মিলিত আনন্দের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব নিয়ে আক্ষেপ।
মামুনুর রশীদ বলেন, একসময় এ ধরনের উৎসবে মানুষ একসঙ্গে মিলিত হতেন। পারস্পরিক আনন্দ ভাগাভাগি এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠত নিবিড় সামাজিক বন্ধন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ সেই মিলনের আনন্দ ও সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, যা অনভিপ্রেত।
তাঁর মতে, উৎসব-অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে একত্র করা এবং প্রত্যেকের মনের কথা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা। আয়োজনের মধ্য দিয়ে যদি ঐক্য ও সম্প্রীতির সুর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে একজন মানুষও সবার হয়ে উঠতে পারেন। অন্যদিকে, উৎসব যদি মানুষকে এক করার পরিবর্তে বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
এ কারণে ভিন্নতা ও বিভেদকে প্রাধান্য না দিয়ে অভিন্ন চেতনায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি কেবল বিনোদনে নয়; বরং মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত এবং সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।
শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা
শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় ফিরে পেলেন শৈশবের স্মৃতি
উৎসবে শিশু-কিশোরদের গান, নাচ ও উপস্থাপনা মুগ্ধ করে অভিনেতা মামুনুর রশীদকে। তাদের প্রাণবন্ত পরিবেশনার মধ্যে তিনি খুঁজে পান নিজের শৈশবের সাংস্কৃতিক পরিবেশের স্মৃতি। তাঁর অনুভূতিতে, উৎসবের আয়োজন যেন এক টুকরো শরৎকে জীবন্ত করে তুলেছে—যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশেছে মানুষের হাসি, আনন্দ ও একে অপরের কাছে আসার আকাঙ্ক্ষা।
শরতের কাশফুল, শুভ্র আকাশ, কেয়া ফুলের সৌরভ আর ঋতুবদলের মায়াবী আবেশের অনুষঙ্গে উৎসবের প্রতিটি পরিবেশনা দর্শকদের মনে সৃষ্টি করে আনন্দের অনুরণন। শরতের স্নিগ্ধতা আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রাণচাঞ্চল্য মিলেমিশে রচনা করে এক স্মরণীয় দিনের গল্প।
সব মিলিয়ে ‘শরৎ উৎসব-১৪৩৩’ হয়ে ওঠে কেবল গান, নৃত্য, আবৃত্তি কিংবা চিত্রাঙ্কনের আয়োজন নয়; বরং মানুষে মানুষে সংযোগ, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চার এক উজ্জ্বল উপলক্ষ। সুরের মূর্ছনা, নৃত্যের ছন্দ আর শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসে মুখর এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দেয়, শরতের সৌন্দর্য প্রকৃতিতে যেমন, তেমনি মানুষের মিলনেও। বিভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা।
