মাত্র ১৫ বছরের সরকারি চাকরি। বৈধ আয়ের পরিমাণ আনুমানিক ৯০ লাখ টাকা। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিজের ও স্ত্রীর নামে ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, বিপুল জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেন্ট-এ-কার ব্যবসা, দামী ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে।
অ্যাডহক নিয়োগ থেকে বিতর্কিত উত্থান
তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ৭ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ের বোদাগঞ্জ উপজেলায় অ্যাডহক ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হিসেবে যোগ দেন মনিরুজ্জামান সরকার। ছয় মাস পর স্থায়ী নিয়োগ পেয়ে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় বদলি হন। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তার বিতর্কিত উত্থান শুরু হয়।
অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, মাত্র দেড় দশকের চাকরি জীবনে বৈধ আয়ের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।
ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামে সম্পদের বিস্তৃত তালিকা
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার মিরপুর রূপনগরের মিল্কভিটা রোডে এবিসি হোমস প্রকল্পের ষষ্ঠ তলায় ১,৪৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং ১২০ বর্গফুটের একটি কার পার্কিং ক্রয় করেন তিনি। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
এছাড়া রংপুর নগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় ‘জান্নাত’ নামে তিনতলা একটি বাড়ি, কলেজ রোডে ‘মুনিবা ছাত্রাবাস’ নামে তিনতলা আবাসিক হোস্টেল, বিনোদপুর ও আলমনগরে একাধিক প্লট, কুড়িগ্রামের চিলমারী ও উলিপুরে জমি এবং স্ত্রীর নামে আরও একাধিক সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজ এলাকায় কুড়িগ্রামের চিলমারীতে দোতলা বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি শাপলা চত্বরে কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এছাড়া ছয়টি মাইক্রোবাস রেন্ট-এ-কার ব্যবসায় পরিচালিত হচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য রয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকার একটি গাড়ি।
সূত্রের দাবি, সম্প্রতি তেলের পাম্প ব্যবসাতেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তিনি। এছাড়া স্ত্রী আরফাতুন নাহারের বড় ভাইয়ের নামেও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকারীদের দাবি, নামে-বেনামে ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামে আরও সম্পদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় ২০১৪-১৬ সময়কালে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে বরাদ্দকৃত প্রায় ১০ কোটি টাকার বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে কিছু কাজ সম্পন্ন করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ঈদগাহ, রাস্তা সংস্কার ও মাটি ভরাটসহ অন্তত ৩০টিরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, অনেক প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ও সদস্যদের স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলন করা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি, কিংবা আংশিক কাজ দেখিয়ে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
অফিস সংস্কার ও সরঞ্জাম কেনার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অফিস সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ পাওয়া অর্থের যথাযথ ব্যবহার না করে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে কম্পিউটার কেনার নামে দুই দফায় বরাদ্দ নেওয়ার পরও সরঞ্জাম না কেনার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ব্যাংকে কোটি টাকার লেনদেন
অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, মনিরুজ্জামান সরকার ও তার স্ত্রীর নামে এনআরবিসি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য মিলেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অবৈধ সম্পদ বৈধ দেখাতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নামমাত্র ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বদলি বাণিজ্য ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন মনিরুজ্জামান সরকার। পরে পিআইওদের বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালকের (এপিডি) দায়িত্ব পালনকালেও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।
মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে যা বললেন
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, আমার সম্পদসহ সকল বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমি অবগত করেছি। এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না।
টিআইবির মতামত
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কারও আয়ের সঙ্গে যদি অর্জিত সম্পদের অসঙ্গতি থাকে, তাহলে দুদক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিষয়টি তদন্ত করা উচিত। তদন্তে যদি আয়ের সঙ্গে সম্পদের মিল না পাওয়া যায়, তাহলে ওই ব্যক্তিকে সম্পদের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হবে। এটাই জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার মূলনীতি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ অনুসন্ধানভিত্তিক। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ভর করবে।
