বরফ-পাথর-কাদার ধসে ৯০০ শ্রমিক আটকা পড়ার পর অবশেষে মিলল স্বস্তির খবর; একজনের শরীর কাদায় ঢাকা, অন্যজনকে গর্ত থেকে স্ট্রেচারে উদ্ধার। ছবি : সংগৃহীত
নয় দিন ধরে অন্ধকার টানেল। চারদিকে বরফ, পাথর আর কাদার স্তূপ। বাইরে স্বজনদের উৎকণ্ঠা, ভেতরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। শেষ পর্যন্ত সেই ভয়াবহ ধসের নয় দিন পর নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টানেল থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই শ্রমিককে।
শুক্রবার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টানেল থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ নয় দিন পর তাঁদের জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় ঘটনাস্থলে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
উদ্ধার হওয়া দুজন হলেন আপার ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ এবং মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহার্জন। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠের কার্যালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে ৯ দিন!
উদ্ধারকর্মীরা জানান, গত ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উজানে হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও কাদার প্রবল স্রোতে উপত্যকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে অন্তত ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে প্রায় ৯০০ মানুষ আটকা পড়েছিলেন।
এরপর থেকেই শুরু হয় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজ চলতে থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শুক্রবার টানেলের ভেতর থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা।
গর্ত থেকে স্ট্রেচারে কবির, পিঠে করে বের হলেন সঞ্জয়
নেপালি কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, কবির মহার্জনকে মাটির একটি গর্ত থেকে উদ্ধার করে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁকে বের করে আনার সময় ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়েন।
অন্যদিকে সঞ্জয় সাহকে একজন উদ্ধারকর্মীর পিঠে করে টানেলের বাইরে আনা হয়। দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থাকার কারণে তাঁর শরীর ও মুখ কাদায় ঢাকা ছিল।
উদ্ধারের পর টানেলের কাছেই একটি তাঁবুতে সেনাবাহিনীর চিকিৎসকেরা সঞ্জয় সাহের চিকিৎসা দেন। তাঁকে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে রাখা হয়।
এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘তার নাম সঞ্জয় সাহ। তিনি মেকানিক্যাল কন্ট্রোল রুমে কাজ করতেন।
একজনের অবস্থা গুরুতর, অন্যজন তুলনামূলক স্থিতিশীল
জ্বালানিমন্ত্রীর এক সহকারী জানান, কবির মহার্জন হাত-পা নাড়াতে পারছেন না। তবে সঞ্জয় সাহের আঘাত গুরুতর নয়।
উদ্ধার হওয়া দুজনকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
‘পুরো পরিবার খুবই খুশি’
কবির মহার্জনের ভাই আমির মহার্জন জানান, এখনো সরকারি কোনো সূত্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খবর পাননি তাঁরা। তবে হাসপাতালে যেতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সংবাদে শুনেছি আমার ভাইকে পাওয়া গেছে। পুরো পরিবার খুবই খুশি।
নয় দিন ধরে নিখোঁজ থাকা স্বজনকে জীবিত পাওয়ার এই খবর তাই শুধু একটি উদ্ধার অভিযান সফল হওয়ার ঘটনা নয়—দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর একটি পরিবারের কাছে যেন ফিরে আসা জীবনের বার্তা।
ভয়াবহ বিপর্যয়ে হাজারো মানুষ নিখোঁজ
তবে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের স্বস্তির মাঝেও ভয়াবহ এই দুর্যোগের ক্ষত গভীর। ত্রিশূলী নদীর উজানে হিমবাহ ধসের ঘটনায় নেপালে অন্তত ১ হাজার ২৫২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী শহর ও গ্রামগুলোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক ও স্কুল ভেসে গেছে। এখনো ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
চীনের পক্ষ থেকে তিব্বতে ২১ জন নিহত ও ৫৪১ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানানো হয়েছে।
সবকিছুর মাঝেও ধ্বংসস্তূপের গভীর অন্ধকার থেকে নয় দিন পর দুই শ্রমিকের জীবিত ফিরে আসা উদ্ধারকর্মীদের জন্য যেমন বড় সাফল্য, তেমনি স্বজনদের কাছে এটি এক বিরল আশার আলো।
সূত্র: রয়টার্স
