মাদ্রাসায় বছরের পর বছর অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত তুলেছেন বেতন-ভাতা। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিজের বাসায় রেখে পরিচালনা করেছেন প্রশাসনিক কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন ফি ও সরকারি অনুদানের অর্থ ব্যবস্থাপনায়ও উঠে এসেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। এসব অভিযোগের তদন্ত শেষে মহেশখালী পুটিবিলা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইনকে মোট ৯৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তার এমপিও বাতিলসহ একাধিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ১৬ বছর ধরে অবৈধভাবে অধ্যক্ষের পদে বহাল ছিলেন মোহাম্মদ আমির হোসাইন। এর মধ্যে শেষ তিন বছর কর্মস্থলে উপস্থিত না হয়েও তিনি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের অনুরোধ এবং শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) বিশেষ তদন্ত পরিচালনা করে। সরেজমিন তদন্ত শেষে গত ২০ জুলাই কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে নিয়োগ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
অবৈধ নিয়োগে দীর্ঘ ১৬ বছর, কোটি টাকার কাছাকাছি বেতন উত্তোলন
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালের ২০ মার্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন আমির হোসাইন। একই বছরের ২৩ আগস্ট গভর্নিং বডির সভায় তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। কিন্তু ২০১০ সালে কোনো বৈধ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তিনি পুনরায় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।
এর ফলে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ৭৮ লাখ ১২ হাজার ৭৫ টাকা বেতন-ভাতা অবৈধভাবে গ্রহণ করেছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত, তবুও চলেছে বেতন উত্তোলন
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বিনা অনুমতিতে একটানা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের ফোন বা অন্য কোনো যোগাযোগেরও জবাব দেননি। এমনকি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ থাকলেও দীর্ঘদিন সেখানে অংশ নেননি।
এই সময়ে তিনি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০০ টাকা বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অর্থও ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল নিজের বাসায়
মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, গত তিন বছর ধরে ক্যাশ বই, ভাউচার, ভর্তি রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব বিবরণীসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নথিপত্র অধ্যক্ষ কক্সবাজার শহরে নিজের বাসায় সংরক্ষণ করেছেন।
ফলে তদন্তকারী দল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন যাচাই করতে গিয়ে চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়ে।
শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের কম্পিউটারেও অনিয়ম
২০১৬ সালে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানে ১৭টি কম্পিউটার সরবরাহ করা হলেও তদন্তে দেখা যায়, বর্তমানে মাত্র ৯টি কম্পিউটার রয়েছে। অবশিষ্ট কম্পিউটার এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুদান ও শিক্ষার্থীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বিশেষ করে কক্সবাজার জেলা পরিষদ থেকে পাওয়া উন্নয়ন অনুদান ও বরাদ্দের অর্থ প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপাধ্যক্ষ লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, অধ্যক্ষের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার ফি এবং উন্নয়ন তহবিল নিয়ন্ত্রণ করত এবং ওই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভোগ করত।
সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা সুপারিশ
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, সহকারী শিক্ষিকা জান্নাত আরা বেগম শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বেতন ও পরীক্ষার ফি মূল তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন এবং এতে অধ্যক্ষের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় তার বেতন-ভাতা স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে।
গভর্নিং বডি বাতিলের প্রস্তাব
দীর্ঘদিন অধ্যক্ষের অনুপস্থিতি, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় বর্তমান গভর্নিং বডির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে বর্তমান গভর্নিং বডি বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিআইএ বলেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির শর্ত বিধিমালা-১৯৭৯ এবং বর্তমান জনবল কাঠামোর গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে। এ কারণে ৯৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ফেরত, এমপিও বাতিল এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ ফেরত না দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অধ্যক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
তবে গত ২১ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন আগে আদালত, জেলা প্রশাসন এবং তৎকালীন গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে নিষ্পত্তি হওয়া একটি ঘটনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
